বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রিক সার্বভৌমত্ব সীমিত হয়ে পড়ার প্রবণতা বা ‘ডি-সভেরেনাইজেশন’ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া স্বেচ্ছায় বা কৌশলগত বাধ্যবাধকতার নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে, তবে এর সামাজিক ও জাতীয় প্রভাব পড়ছে সুদূরপ্রসারী। জাতীয়তাবাদী আবেগ আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আড়ালে রাষ্ট্র তার নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যা এখন বেশ দৃশ্যমান। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সীমিতকরণ প্রক্রিয়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে হয়তো দেশ-বিদেশে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছে, তবে এর সামাজিক ফল হতে পারে উদ্বেগজনক। সার্বভৌমত্ব সীমিতকরণ প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে ‘ডি-সভেরেনাইজেশন’ বলে উল্লেখ করা যায়। এটা হতে পারে স্বেচ্ছামূলকভাবে, জবরদস্তিমূলক পথেও। রাজনীতি ও সমাজজীবনে এ দেশে ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্তাপ ও ব্যবহার অত্যধিক। তার আড়ালেই সার্বভৌমত্ব সংকোচন বহুকাল ধরে ধীরলয়ে এগোচ্ছে এবং এখন লাজলজ্জার মোড়ক ভেঙে সেটা বেশ স্পষ্ট অবয়ব পেয়েছে।
সার্বভৌমত্বের এই সংকোচন কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কাঠামোর নিয়মকানুন মেনে চলার প্রয়োজনে অনেক দেশই তাদের কর্তৃত্বের কিছুটা ছাড় দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, বিভিন্ন সনদে সম্মতির জন্য দেশীয় বিধিবিধান সংশোধন নিয়ন্ত্রিত সার্বভৌমত্বের কথা জানায়। রাষ্ট্রসমূহ অনেক সময় লাভ-লোকসানের তুলনামূলক হিসাব কষে কর্তৃত্বের ছাড় দেয় অনেকটা জাতীয় সম্মতিতে।
কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে শুল্কচুক্তি কিংবা অতীতে নির্বাচনের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সরাসরি নির্দেশনার মতো ঘটনাগুলো আমাদের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হওয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়া রাষ্ট্রীয় গোপন চুক্তির আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাড়া বা লিজ দেওয়ার বিষয়গুলো জনসমক্ষে না আসায় জনগণের মধ্যে এক ধরণের অবিশ্বাসের জন্ম নিচ্ছে। বাংলাদেশে উভয়ের মিশ্র পদ্ধতিতে হচ্ছে। সার্বভৌমত্ব হাতছাড়া হওয়ার বিষয় বহু বিশ্বগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতায় আছে। ইইউর মতো আঞ্চলিক ‘মুক্তাঞ্চল’ রাষ্ট্রীয় একক সার্বভৌমত্বকে সীমিত করে ভিন্ন ধাঁচের যৌথ সার্বভৌমত্বের মডেলও তুলে ধরছে। তবে বাংলাদেশে ঘটছে ভিন্ন ধরনের কিছু। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা যেভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে শুল্কচুক্তি করল এবং এর পক্ষে যেভাবে সমাজের একটা সমর্থক গোষ্ঠী দেখা গেল কিংবা সম্প্রতি যেভাবে সৌদি আরব তথ্য-উপাত্ত না দিয়ে দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল এবং বাংলাদেশের একজন নীতিনির্ধারক যেভাবে এতে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো যখন রাষ্ট্র তার স্রষ্টা মুক্তিযোদ্ধাদেরই যথাযথ সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়। পিরোজপুরের মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার প্রদানের সময় রাষ্ট্রের লুকোচুরি সেই নাজুক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। স্থানীয় অর্থনীতিতে ইপিজেডের মতো জায়গায় মৌলিক শ্রম অধিকার সংকুচিত করার মাধ্যমে যে অভ্যাসের সূচনা হয়েছিল, তা আজ দেশীয় নীতি ও কেনাকাটার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। এর ফলে আজ যখন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা বন্দর অন্যের হাতে লিজ দেওয়া হয়, তখন উন্নয়নের নামে যুক্তি সাজানো সহজ হয়ে ওঠে। তবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিশ্চিতভাবে আরও বড় আয়তনে নাজুকতার কথাও বলছে, যখন সে তার স্রষ্টা মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে গার্ড অব অনার দেয়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাগরিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখন প্রকট। সৌদি আরবে সম্প্রতি তথ্য-উপাত্ত ছাড়া দুজন বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। অথচ বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি জানতেও পারল না। যেখানে ২০২৩ সালে কাতারে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আট ভারতীয়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে নয়াদিল্লি কূটনৈতিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে তাদের নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করেছিল, সেখানে বাংলাদেশের এই নিশ্চুপ অবস্থান রাষ্ট্রের চরম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
এই জাতীয় অপমানের ট্রমা সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অভিভাবকত্ব হারিয়ে ফেলার কারণেই সাধারণ মানুষ আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মানতে চাইছে না। এর ফলে অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্যিক মনস্তত্ত্ব বাড়ছে, যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ। সার্বভৌমত্বের পুনঃপুন সংকোচন সাধারণ মানুষের মন থেকে জাতীয় গৌরববোধ বিলুপ্ত করে দিচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, সার্বভৌমত্বের এই সংকটের জন্য সাধারণ জনগণ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী ‘কুলীন সমাজ’ বা নীতিনির্ধারকরাই দায়ী। তারা যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে ব্যর্থ হন, তখন তার দায়ভার বহন করতে হয় গোটা জাতিকে। এই ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের স্বার্থ দেখার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে, যা সমাজকে একটি সহিংস ও হতাশগ্রস্ত জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক অনেক কাঠামো সার্বভৌমত্বের পরম ধরন বহু আগে খাটো করেছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























