সফল দুর্গাপূজা ও তারেক রহমানের অর্জন
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় বিশ্বাস।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর এটিই ছিল তার নেতৃত্বে প্রথম দুর্গাপূজা। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার মণ্ডপ বেড়েছে। সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করে। এর পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কার্যত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান সরকারি চাকরিজীবীরা। মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নথিভুক্ত প্রায় আট একর জমির মধ্যে আনুমানিক ৫ দশমিক ৬ একর অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে।
উৎসবের আয়োজন, ব্যাপক নিরাপত্তা ও সরকারি সহযোগিতার কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে তিনি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
উৎসবের আনন্দ এবং সরকারি আন্তরিকতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। লেখক ও অধিকারকর্মী সাদিকুর রহমান খান, চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং লেখক ফাহাম আবদুস সালাম উৎসবের প্রশংসা করেছেন। লেখক: দীপ হালদার একজন লেখক এবং দ্যপ্রিন্ট-এর সহযোগী সম্পাদক।
নিরাপত্তার নজিরবিহীন আয়োজন
- এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে উৎসব উদ্যাপিত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ছিল ২৫৮টি।
- বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছিল।
- জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম।
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তবর্তী আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের সুরক্ষায় ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করে টহল জোরদার করে।
- পূজা উপলক্ষে সরকারিভাবে টানা পাঁচ দিনের ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সামাজিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উৎসব ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দেশজুড়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি মণ্ডপে আটজন এবং অন্য মণ্ডপগুলোতে ছয়জন করে সদস্য মোতায়েন করা হয়। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, আগের বছরগুলোতে উৎসব ঘিরে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল, এবারের আয়োজন তার থেকে আলাদা।
ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান জানান, বাংলাদেশের এমন প্রাণবন্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ পূজা তিনি আগে কখনও দেখেননি। এছাড়া কলকাতার জনপ্রিয় উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের প্রশংসা করে এ বছরকে ‘অসাধারণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়তা করেছে। কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের প্রশংসাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের জাঁকজমক দেখে আমি বিস্মিত। কলকাতার পূজামণ্ডপগুলোকে যারা পুরস্কার দেয়, তাদের চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর জন্য আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা উচিত।
চ্যালেঞ্জের মুখে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা
উৎসবের সাফল্য সত্ত্বেও হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
উৎসবের আগে সারা দেশে অন্তত ৩৪টি স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে তিনি নিয়মিত সরব ছিলেন। এদিকে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন।
হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকার জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক ইসলামপন্থী বক্তা দুর্গাপূজাকে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব দিয়ে হিন্দুদের বাস্তব পরিস্থিতি বদলে দেয়া সম্ভব নয়, যদি না দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেও দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপিকে সমর্থন করেছিল, যা তারেক রহমানের জন্য একটি বড় শক্তি। তবে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ এখন তার সামনে উপস্থিত
- শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনসাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিন্দু ভোটারদের বড় একটি অংশকে আওয়ামী লীগের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
- ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর চাপবিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠন ও তাদের নেতাদের অসহিষ্ণু বক্তব্য সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
- সম্পত্তি দখল ও আইনি সুরক্ষাএনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্প্রতি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসে অবৈধভাবে দখল হওয়া ৫ দশমিক ৬ একর জমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা মন্দির কমিটির দীর্ঘদিনের দাবি।
পরিশেষে, হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা ধরে রাখার জন্য তারেক রহমানকে সারা বছর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং হামলাকারীদের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনার মতো বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের এই পরবর্তী ধাপগুলোই নির্ধারণ করবে তার রাজনৈতিক সাফল্যের স্থায়িত্ব। তবে এই নতুন রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে হলে তাকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সংগঠন দুটি সারা বছর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে উৎসবের জাঁকজমক দিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















