ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আসন্ন উপনির্বাচন নিয়ে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বালিয়া বাজারের মতো এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের নাম। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে মূল লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এই এলাকার সনাতনী সম্প্রদায়ের বিশাল ভোটব্যাংকই মূলত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে। বালিয়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। তাঁদের একজন বললেন, ‘তোমরা যাই কহ, ধানের শীষই জিতিবে। পাশ থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লাক ফেলায় দেছেন। তাঁদের কথা শুনে হরেক চন্দ্র বললেন, ‘এইঠে জিতিবা গেলে হামারলার ভোট নাগিবেই।’। হামার (সনাতনী সম্প্রদায়) ভোট নাকি দুই দলেরই নাগে। স্থানীয় রাজনীতিক, ভোটার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এবারের উপনির্বাচনেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট জয়-পরাজয় ঠিক করবে। তাঁরা আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলে প্রচার আছে।
আগামী ২৯ অক্টোবর এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)। অতীতে এই আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিগত ১১টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টি একবার জয়ী হয়েছিল, কিন্তু এবার সেই সমীকরণ বদলে গেছে।
আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। স্থানীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, যাদের ভোট মূলত প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংখ্যালঘু নেতারা মনে করেন, নির্বাচন ঘিরে তাদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করে, তাই ভোটের পরিবেশ শান্ত রাখা জরুরি। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত বলেন, ভোটের পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যাতে কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা হামলার শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রার্থীর বড় দায়িত্ব।
ভোট টানতে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করছেন। তিনি জানান, তার শৈশব ও কৈশোর মন্দিরঘেঁষা পরিবেশে কাটায় তাদের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক। তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার রক্ত থাকতে কখনোই সংখ্যালঘুদের ক্ষতি হতে দেবেন না। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন গত আগস্ট মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া হামলার সময় পাশে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে প্রতিটি ঘটনার যথাযথ বিচার নিশ্চিত করবেন এবং ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকবেন। সড়কের পাশে গোটা কয়েক রিকশা ভ্যান নিয়ে অপেক্ষায় চালকেরা। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সে সময় আমরা তাঁদের পাশে ছিলাম।
নির্বাচন কমিশনও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ঠাকুরগাঁওয়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভোটাররা যাতে ভীতিহীন ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটের দিন এবং এরপরও কঠোর অবস্থানে থাকবে। সেখানকার মন্দিরের দেয়াল আমাদের জায়গার সীমানা। আমাদের বাড়ির জবা ফুলে আপনাদের পূজা হয়। আবার আপনাদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতায় আমাদের অসুখ সারে।
বিগত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ভোটার ২ হাজার ৩০ জন। সেখানে আগের নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১ হাজার ৩৫৩ ভোট পেয়েছিলেন, বিপরীতে দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ২২৯ ভোট। এছাড়া দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ হাজার ১৪৯ ভোটারের অধিকাংশ সনাতনী। সেখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ১ হাজার ৮৭৬টি ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৫০৯টি ভোট। ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩ হাজার ৭৫৯ ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশই সংখ্যালঘু ভোটার, সেখানেও বিএনপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ২ হাজার ১৯৬ এবং জামায়াতের ছিল ৪৭৬। এমন কেন্দ্রগুলোতে বিএনপি নিজেদের ব্যবধান ধরে রাখতে চায়, আর জামায়াত চায় সেখানে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে ভোটের পাল্লা ভারী করতে। স্থানীয়দের হিসাবে, কেন্দ্র দুটির মোট ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের ভোটকেন্দ্র দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























