ঢাকা ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্মরণকালের সেরা দুর্গাপূজা উপহার দিলেন দেশনায়ক  তারেক রহমান ঢাকার বাস টার্মিনাল ও অটোরিকশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সোহেল গরিবের বিচার, ধনীর বিচার এক করতে হবে —এটাই তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশ আইএইচএফ নেশনস ট্রফিতে ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ বাংলাদেশ কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্বিগুণ যাত্রী সামলাতে হিমশিম দেশের বিমানবন্দরগুলো মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল দলিল পেশ করলো তুরস্ক সাইবার আইনে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকিতে ফাঁসের ঘটনায় বিএআরসির সহকারী পরিচালক আটক: যুব উন্নয়নের ৪৫তম বিসিএসে গেজেট থেকে বাদ: অনিশ্চিত জীবনে ৫৬ মেধাবী

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে সক্রিয় বাংলাদেশি প্রতারক চক্র

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি মুসলিম সমাজে এক গভীর আস্থা ও আকাঙ্ক্ষার নাম। বহু তরুণের কাছে এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং আত্মগঠন, ধর্মীয় জ্ঞান এবং নৈতিক উৎকর্ষের এক মহাসড়ক। কিন্তু সেই আস্থার ভিতরেই নীরবে জন্ম নিয়েছে এক অন্ধকার বাস্তবতা প্রতারণা, জালিয়াতি ও মানবপাচারের এক সুসংগঠিত চক্র, যা এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযোগ, তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভাসিত ঘটনার সূত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশি পরিচয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ‘ছাত্র’ সত্তার আড়ালে গড়ে তুলেছে অপরাধের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।

মিশরের সরকারি সিল জাল করা, ভুয়া স্কলারশিপ লেটার তৈরি, ভুয়া আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পেপার তৈরি, অবৈধ ডলার লেনদেন, এমনকি মিশরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানবপাচার এই সব গুরুতর অভিযোগ এখন আর গুঞ্জন নয়, বাস্তবতার নির্মম দলিল।

এই চক্রের কার্যপদ্ধতি সুপরিকল্পিত এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে কৌশলী। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখানো হয় তরুণদের, তাদের পরিবার থেকে নেওয়া হয় বিপুল অর্থ। এরপর তাদের মিশরে এনে আল-আজহারের ভাষা কোর্সে ভর্তি করানোর মাধ্যমে একটি বৈধতার আবরণ তৈরি করা হয়।

কিন্তু এই ‘বৈধতা’ অনেক ক্ষেত্রেই একটি ছদ্মবেশ যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরও বড় পরিকল্পনা। একাংশকে পরে অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি লিবিয়ায় আটক হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশির কাছ থেকে আল-আজহার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র উদ্ধার হওয়া এই নেটওয়ার্কের ভয়াবহ বিস্তারকে উন্মোচিত করেছে।

মিশরে পৌঁছানোর পরও এই প্রতারণার শিকারদের দুর্ভোগ থামে না, বরং শুরু হয় নতুন এক শোষণচক্র। বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের নামে ধার্য করা হয় অযৌক্তিক ফি ফাইল জমা, এম্বাসি লেটার, মেডিকেল টেস্ট, এমনকি সরকারি বিনামূল্যের সিল নেওয়ার নামেও আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সেবা হয় ভুয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয়।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট বাসায় সীমাবদ্ধ রেখে মানসিক চাপ প্রয়োগ করে ধারাবাহিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়। অর্থ শেষ হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় ততক্ষণে তারা অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

এই অপরাধচক্রের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর পরিণতি ভোগ করছে নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা। মিশরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বাংলাদেশি পরিচয় এখন ক্রমেই সন্দেহের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।

জাল সিলের কারণে বহু শিক্ষার্থীর ইকামা প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, কেউ কেউ পাসপোর্টে স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশনাও পাচ্ছেন। অথচ এদের অনেকেই পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে, এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে।

অন্যদিকে, এই অপরাধের মূল হোতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা সুসংগঠিত, প্রভাবশালী এবং অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘দায়িত্বশীল’ মহলের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত। অভিযোগ উঠেছে কিছু ছাত্রনেতা ও সংগঠনের সঙ্গে এই চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা শুধু অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে না, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়, এটি একটি জাতির সুনাম, একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা এবং একটি পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, মিশরের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরছে।

এখন সময় নীরবতা ভাঙার। এই প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই। ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সমান জরুরি।

স্বপ্ন বিক্রির এই নিষ্ঠুর বাণিজ্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন এখনই। আল-আজহারের নাম যেন আর কোনো অপরাধের আড়াল না হয়, সেই দায় আমাদের সবার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে সক্রিয় বাংলাদেশি প্রতারক চক্র

আপডেট সময় ১০:৪৭:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক: 

কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি মুসলিম সমাজে এক গভীর আস্থা ও আকাঙ্ক্ষার নাম। বহু তরুণের কাছে এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং আত্মগঠন, ধর্মীয় জ্ঞান এবং নৈতিক উৎকর্ষের এক মহাসড়ক। কিন্তু সেই আস্থার ভিতরেই নীরবে জন্ম নিয়েছে এক অন্ধকার বাস্তবতা প্রতারণা, জালিয়াতি ও মানবপাচারের এক সুসংগঠিত চক্র, যা এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযোগ, তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভাসিত ঘটনার সূত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশি পরিচয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ‘ছাত্র’ সত্তার আড়ালে গড়ে তুলেছে অপরাধের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।

মিশরের সরকারি সিল জাল করা, ভুয়া স্কলারশিপ লেটার তৈরি, ভুয়া আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পেপার তৈরি, অবৈধ ডলার লেনদেন, এমনকি মিশরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানবপাচার এই সব গুরুতর অভিযোগ এখন আর গুঞ্জন নয়, বাস্তবতার নির্মম দলিল।

এই চক্রের কার্যপদ্ধতি সুপরিকল্পিত এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে কৌশলী। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখানো হয় তরুণদের, তাদের পরিবার থেকে নেওয়া হয় বিপুল অর্থ। এরপর তাদের মিশরে এনে আল-আজহারের ভাষা কোর্সে ভর্তি করানোর মাধ্যমে একটি বৈধতার আবরণ তৈরি করা হয়।

কিন্তু এই ‘বৈধতা’ অনেক ক্ষেত্রেই একটি ছদ্মবেশ যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরও বড় পরিকল্পনা। একাংশকে পরে অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি লিবিয়ায় আটক হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশির কাছ থেকে আল-আজহার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র উদ্ধার হওয়া এই নেটওয়ার্কের ভয়াবহ বিস্তারকে উন্মোচিত করেছে।

মিশরে পৌঁছানোর পরও এই প্রতারণার শিকারদের দুর্ভোগ থামে না, বরং শুরু হয় নতুন এক শোষণচক্র। বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের নামে ধার্য করা হয় অযৌক্তিক ফি ফাইল জমা, এম্বাসি লেটার, মেডিকেল টেস্ট, এমনকি সরকারি বিনামূল্যের সিল নেওয়ার নামেও আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সেবা হয় ভুয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয়।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট বাসায় সীমাবদ্ধ রেখে মানসিক চাপ প্রয়োগ করে ধারাবাহিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়। অর্থ শেষ হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় ততক্ষণে তারা অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

এই অপরাধচক্রের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর পরিণতি ভোগ করছে নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা। মিশরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বাংলাদেশি পরিচয় এখন ক্রমেই সন্দেহের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।

জাল সিলের কারণে বহু শিক্ষার্থীর ইকামা প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, কেউ কেউ পাসপোর্টে স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশনাও পাচ্ছেন। অথচ এদের অনেকেই পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে, এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে।

অন্যদিকে, এই অপরাধের মূল হোতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা সুসংগঠিত, প্রভাবশালী এবং অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘দায়িত্বশীল’ মহলের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত। অভিযোগ উঠেছে কিছু ছাত্রনেতা ও সংগঠনের সঙ্গে এই চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা শুধু অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে না, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়, এটি একটি জাতির সুনাম, একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা এবং একটি পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, মিশরের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরছে।

এখন সময় নীরবতা ভাঙার। এই প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই। ভুক্তভোগীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সমান জরুরি।

স্বপ্ন বিক্রির এই নিষ্ঠুর বাণিজ্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন এখনই। আল-আজহারের নাম যেন আর কোনো অপরাধের আড়াল না হয়, সেই দায় আমাদের সবার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর