দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত এক গণবিক্ষোভ সমাবেশে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি সংশ্লিষ্ট এই দুই মন্ত্রী নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে না দাঁড়ান, তবে তার দল সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করবে। সেই মিছিলের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘেরাও করে দাবি আদায় করা হবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেছেন, ‘এই দুজন মন্ত্রীই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে দেশের সর্বত্র আমরা মিছিল করব। চলমান নৈরাজ্য ও গুম–খুনের দায় নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, যেমন খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামের প্রতিবাদে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ক্রমবর্ধমান রাহাজানিতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অথচ বর্তমান সরকারের জনগণের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা নেই, যার বড় দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের চেয়ে মন্ত্রী সংবিধান সংশোধন ও গণভোটের রায় পরিবর্তনের মতো কাজে বেশি সময় দিচ্ছেন। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বর্তমান সরকারের দেশ পরিচালনার পরিকল্পনার সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, লন্ডনে বসে তিনি দুর্নীতি, দখলদারত্ব ও লুটপাটের ছক তৈরি করে দেশে ফিরেছেন। তিনি একে ‘নব্য স্বৈরাচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, বিগত স্বৈরাচারকে যেভাবে সরানো হয়েছে, এবারও একইভাবে তাদের পরাজিত করা হবে। এছাড়া ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন নিয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকার সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে না, তাই তরুণদেরই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে সমাবেশে তিনি বলেন, ‘কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি।
সীমান্ত হত্যা এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে বিভিন্ন চুক্তি ও করিডর ইস্যু নিয়েও নাহিদ ইসলাম কড়া ভাষায় কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো করিডর মেনে নেওয়া হবে না। ডিসেম্বরের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে পুনর্নির্ধারণ না হলে পুনরায় রাজপথে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া ঢাকা সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের ষড়যন্ত্র করে হারানোর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি হুশিয়ারি দেন যে, এবার কোনো কারসাজিই টিকবে না। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, বাংলাদেশের জনগণ আবারও মাঠে নামবে। ‘এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’ বলে উল্ল। সীমান্ত হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন, দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। জাপানে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তারেক রহমান।
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজি গ্যাসের দাম যেখানে হাজার টাকার কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশে তা ২৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। জ্বালানিমন্ত্রীকে এর জবাব দিতে হবে। তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান। সেইসাথে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান তিনি। কলকাতায় ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না।
এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সমাবেশে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকলেও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম বক্তব্য দেননি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির এনসিপি প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে কয়েক হাজার কর্মী মিছিল নিয়ে শাহবাগে সমবেত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই ছিল দলের সবচেয়ে বড় মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি। সমাবেশের আগে পুরো সপ্তাহজুড়ে ঢাকা জুড়ে লিফলেট বিতরণ ও ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল দলটি। বিকেল ৩টার নির্ধারিত সময়ের আগেই নেতা-কর্মীরা বাংলামোটর ও শাহবাগ এলাকা জনাকীর্ণ করে তোলেন। জাতীয় জাদুঘরের সামনের চত্বর ও আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন নেতা–কর্মীরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদর কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা–৮ আসনে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল। আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পনা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা ভেবেছিল গণ–অভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে, তারাও ইনশাআল্লাহ এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজিত হবে।’।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















