কিশোরী তমা আক্তারের কিডনি জটিলতা শনাক্ত হওয়ার পর গত ১৩ অক্টোবর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে ভর্তি করানো হয়।
১৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে বাবা-মা তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান। তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়নে।
বর্তমানে তার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২২ গুণ বেশি। গত রোববার থেকে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করে ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে। মানিকগঞ্জের আটিগ্রামের বাসিন্দা তমার বাবা রংমিস্ত্রি তরফ আলী জানান, গত এক মাসে জমি বিক্রির টাকা ও ঋণ করে মেয়ের চিকিৎসার জন্য তিনি ৭২ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তাদের অপর তিন সন্তানকে নানির কাছে রেখে তারা এখন হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে পাটি পেতে থাকছেন। প্রতি ডায়ালাইসিসে ৪০০ টাকা খরচ ছাড়াও নিয়মিত ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপের পেছনে তাদের প্রতিদিন অর্থ ব্যয় হচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তমার মা লিপি আক্তারকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তমাকে ৩১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তমার বাবা তরফ আলী আসেন হাতে রক্ত পরীক্ষার ৩৫০ টাকার একটি স্লিপ নিয়ে। এর আগে সকালে ৪০০ টাকার আরেকটি পরীক্ষা করিয়েছেন। মেয়ের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি। তমার বাবা তরফ আলী বলেন, মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রথম দিনই সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। ৬ অক্টোবর ঢাকায় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১২ হাজার টাকায় এমআরআই করান। মা লিপি আক্তার বলেন, গ্রামে তাঁর স্বামীর কোনো ভিটেমাটিও নেই। ঋণ শোধের পর ১৫–২০ হাজার টাকা হাতে ছিল, সেই টাকাও মেয়ের চিকিৎসায় খরচ করে ফেলেছেন। নিজেদের খরচ কমাতে সকালে দুজন দুটো রুটি আর দুপুরে শুধু ডাল–ভাত খান। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার মেয়েটা যে কী সুন্দর। কেউ যদি আমার মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিত, আমি তাঁদের বাসায় দাসি হয়ে থাকতাম!’। স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি খরচ মাত্র ১০৭০ টাকা।
চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন এমন আরও অনেক পরিবার ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগীর চাপ সবসময় ৪ হাজারের বেশি থাকে। ভর্তিকৃত রোগীদের বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচার ও সিংহভাগ ওষুধ সরবরাহ করা হলেও শয্যাসংকটের কারণে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা এবং অ্যাটেনডেন্টদের ব্যক্তিগত খরচের কারণে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, বাজেটের তুলনায় রোগীর চাপ বেশি হলেও কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তবে রোগীর পকেটের খরচ কমাতে সেবার বাজেট বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে ৪২ শতাংশ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। তিনি জানান, রোগীর সেবায় বাজেট আরও বাড়ানো হচ্ছে, এতে রোগীর নিজের পকেট থেকে খরচ কমতে পারে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে।
পটুয়াখালীর জেলে জুয়েল সরদার প্রায় চার মাস ধরে বার্ন ইউনিটের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। ট্রলার থেকে পড়ে ডান পায়ে মারাত্মক জখম হওয়ার পর থেকে তাঁর তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে আড়াই লাখ টাকাই তাকে চড়া সুদে ধার করতে হয়েছে, যা এক বছরে সুদসহ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাড়িতে তিন সন্তান রেখে আসা জুয়েলের স্ত্রী শাহানা জানান, অস্ত্রোপচারের পরও নিয়মিত ৫টি ওষুধের মধ্যে কিছু বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। আগে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল, যেখানে প্রতিদিন ১৫টি ওষুধ সেবনের পাশাপাশি দুটি ইনজেকশনের জন্য ৮৫০ টাকা করে খরচ হতো। ওষুধপথ্য কিছু হাসপাতাল থেকে দেয়, কিছু বাইরে কিনতে হচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের কাজল রানী অর্থোপেডিক বিভাগের ওয়ার্ডে ব্যথায় কাতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। গত বৃহস্পতিবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার এই গৃহবধূর স্বামী বেকার হওয়ায় সংসারে বড় সংকট চলছে। গত এক সপ্তাহে ওষুধ ও ৯টি পরীক্ষার জন্য তাঁর ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেওয়া চার বছরের শিশু তাহমিদের অবস্থাও একই। গত বছরের ২৮ নভেম্বর পাশের বাসার রান্নার চুলায় পড়ে তার হাত ও পা পুড়ে যায়। নড়াইলের বাসিন্দা শিশুটির অফিস সহকারী বাবা ছেলের সুস্থতায় প্রতিনিয়ত টাকা জোগাড়ের লড়াই করছেন।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন মো. হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন, হাসপাতালের সেবা বিনা মূল্যে হলেও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর পুষ্টিকর খাবার ও সহযোগী সদস্যদের থাকা-খাওয়ার খরচই মূলত তাদের আর্থিক সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে গ্রামের নিচু আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র তহবিল থেকে রোগীদের সহায়তার চেষ্টা করা হলেও রোগীর আধিক্যের তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানা গেছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















