দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে বহিষ্কৃত উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনকে জ্যেষ্ঠতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় এখন কার্যকর হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। সংস্থাটির করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) প্রত্যাহার চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এই আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেওয়ায় শরীফ উদ্দিনের দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের বেশি সময়ের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটছে। তাঁর আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আদেশ দেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, যখন দুদক পটুয়াখালী কার্যালয়ে কর্মরত শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তিনি ২০২১ সালের ১৬ জুন পটুয়াখালীতে বদলি হওয়ার আগে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করায় তিনি প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার বিষয়টি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও জানিয়েছিলেন। সেই সময় তার এই আকস্মিক অপসারণ দুদকের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং খোদ কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কর্মীদের মানববন্ধনের মতো বিরল ঘটনাও ঘটে।
দুদকের সেই সময়কার অপসারণের আদেশে জানানো হয়েছিল, কর্মচারী বিধিমালা ২০০৮-এর ৫৪(২) বিধির ক্ষমতাবলে শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতনসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই এই বিধির প্রয়োগের বৈধতা নিয়ে শরীফ উদ্দিন ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। মামলার ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আপিল বিভাগের রায় ও পর্যবেক্ষণের আলোকে বিধিটি সতর্কতার সাথে প্রয়োগের নির্দেশনা দেয়। রিটের শুনানিতে এর আগে ৫৪(২) বিধির ক্ষমতাবলে দুদকের আরেকজন কর্মকর্তাকে (মো. আহসান আলী) চাকরিচ্যুতি নিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগে রয়েছে বলে আদালতে তুলে ধরা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৫ মে হাইকোর্ট এক আদেশে ওই আপিলের (দুদকের আপিল) নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ৫৪ (২) ধারায় চাকরিচ্যুতির বৈধতা নিয়ে শরীফের করা রিটের শুনানি মুলতবি করেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। এই পর্যবেক্ষণসহ বিধিটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুদককে ১২ দফা পর্যবেক্ষণ বা গাইডলাইন অনুসরণ করতে বলা হয়।
এরপর আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হাইকোর্টে শরীফের রিটটির চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত বছরের ৯ জুলাই হাইকোর্ট রায়ে জানান, শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুতির ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির আদেশটি ছিল আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং এটি শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য হবে। আদালত জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন এবং রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধেই দুদক লিভ টু আপিল করেছিল, যা বর্তমান আদেশের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। শরীফের চাকরিচ্যুতি ঘিরে তখন বেশ আলোচনা সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল দেন।
আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন জানিয়েছেন, চেম্বার আদালত দুদকের লিভ টু আপিল আবেদনটি ‘নট টু প্রসিড’ বা না চালানোর কারণে খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে হাইকোর্টের দেওয়া সেই রায়ের কার্যকারিতা পুরোপুরি বহাল থাকল। এখন জ্যেষ্ঠতা ও সব ধরনের বকেয়া সুবিধাসহ চাকরিতে ফেরা শরীফ উদ্দিনের জন্য আইনি কোনো বাধা আর অবশিষ্ট নেই। বিগত বছরগুলোতে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সাবেক এই দুদক কর্মকর্তা এখন চূড়ান্ত জয় পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















