নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বর্তমানে নতুন কৌশলে নাশকতার ছক কষছে। রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনাগুলো একটি বড় নাশকতার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে চালানো হচ্ছে। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোডে বাটা শোরুমের সামনে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যানার প্রদর্শন করে স্লোগান দেয়। মাত্র দশ সেকেন্ড স্লোগান দেওয়ার পর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তারা অলি-গলিতে গা ঢাকা দেয়। পুলিশ এই ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে নাশকতার আলামতও দেখা যাচ্ছে। এসব ঘটনায় দলটির অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছে। পরে ওই নেতাকর্মীরা ৩০ সেকেন্ডেই গলির ভেতর হাওয়া।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই ‘৩০ সেকেন্ডের মিশন’ দলটির নতুন গেরিলা কৌশল। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিকল্পিত; প্রথমে কিছু যুবক ব্যানার নিয়ে বের হয়ে আসে, এরপর ১০ সেকেন্ড ধরে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়। শেষের ১০ সেকেন্ডে ব্যানার ফেলে তারা তিনদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভিডিওগুলো টেলিগ্রামের গোপন গ্রুপে বিদেশে থাকা নেতাদের কাছে পাঠানো হয়। এছাড়া ককটেল বিস্ফোরণের ক্ষেত্রেও তারা একই দ্রুততা অবলম্বন করছে। গত এক সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট ফটক, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর, মগবাজার, মৎস্য ভবন, রামপুরা বিটিভি ভবন, কাফরুল, মিরপুর-১১, বাড্ডা ও পল্লবীসহ মোট ১২টি স্থানে ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং ৯টি বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে প্রায় ৯ হাজার মুখোশ ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেতাদের রায়ের পর থেকে এ ধরনের তৎপরতা বেড়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। সেটি মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে আরেকজন। এলাকাবাসী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা গায়েব হয়ে যায়। গতকাল রাতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় আরও একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
নাশকতার পরিকল্পনায় নিষিদ্ধ দলটির কর্মীরা মূলত তিনটি স্তরে কাজ করছে। প্রথম স্তরে ছাত্রাবাস ও মেসে অবস্থানকারী ছোট দল যারা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে। তাদের দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় স্তরে মাঝারি সারির নেতা, সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা ভাড়া বাসায় থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। খিলগাঁও, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় এ ধরনের অন্তত ৩০টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তৃতীয় ও সবচেয়ে সুরক্ষিত স্তরে রয়েছে অর্থদাতা ও সমন্বয়কারীরা যারা ঘন ঘন হোটেল ও লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট পরিবর্তন করে আত্মগোপনে থাকেন। বিদেশে থাকা নেতাদের নির্দেশে পরিচালিত এই নাশকতায় প্রতি ভিডিও বিস্ফোরণের জন্য তিন থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, যা বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। অন্তত ৩০-৪০ জন ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও সুবিধাভোগী ব্যক্তি এই কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ভিডিও ধারণের জন্য আগে থেকেই একজনকে দায়িত্ব দেয়া থাকে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নিষিদ্ধ দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবাই আত্মগোপনে থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের যোগাযোগ অটুট রয়েছে। টেলিগ্রাম ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে কর্মীদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন হামলার নির্দেশদাতাদের মধ্যে বিদেশে পলাতক মতিঝিল থানা সভাপতি মিরাজ বিশ্বাস ও মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নাম পাওয়া গেছে। নাশকতায় অর্থায়ন ও দল পুনর্গঠনের দায়ে গুলশান থেকে সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিবি পুলিশ প্রতিটি বিভাগকে ১০-১২ জন করে অর্থদাতার তালিকা দিয়ে দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে জাসদ অফিস থেকে আটক হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগে অপারেশনাল পদে রদবদল নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সমালোচনা করছেন। ঘন ঘন বদলির ফলে স্থানীয় সোর্স ও অপরাধীদের গতিবিধি সম্পর্কে নতুন কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত তথ্য থাকছে না। তবে এর মধ্যেও পুলিশ বসে নেই। অপারেশনাল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তার সাথে আওয়ামী লীগ কানেকশনের প্রমাণ মেলায় তাদের সরিয়ে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে পলাতক অর্ধশত কেন্দ্রীয় নেতাকেও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। নিষিদ্ধ দলের এই তৎপরতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠ পর্যায়ের নজরদারি বাড়িয়েছে এবং শীর্ষ নেতাদের গোপন যোগাযোগের মাধ্যমগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















