অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
হারিয়ে যাওয়া ঢাকাই মসলিনের সুদিন ফিরছে। ৩০০ বছর পর বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ‘মসলিন’ কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার হয়েছে।
আবারও দেশে তৈরি হবে মসলিন। যে সুতা থেকে মসলিন তৈরি হতো, সেই ফুটি কার্পাস তুলাগাছ চাষ হচ্ছে দেশেই। শিগগির ওই গাছের তুলা থেকে মসলিন কাপড়ের শাড়ি বা স্কার্ফ তৈরি করা হবে। ওই শাড়ি বা স্কার্ফ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সুখবর জাতিকে জানাবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
মসলিন তৈরির প্রযুক্তি উদ্ঘাটিত হয়েছে জানিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সোমবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বখ্যাত ‘মসলিন’ কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার হয়েছে। শিগগির এ কাপড় আবার উৎপাদন শুরু হবে।
প্রথম মানসম্মত তৈরি মসলিনের শাড়ি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিকে সুখবর দেয়া হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও মসলিনের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে।’
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মসলিন সুতা ও কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের নির্দেশনা দেন। এ লক্ষ্যে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার (১ম পর্যায়) শীর্ষক’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের পরিচালক ও বায়োটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেনের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে দেয়া হয়।
দলের সদস্যরা হলেন : রাবির অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম ফিরোজ আলম, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের বুটেক্সের ডিন আলীমুজ্জামান, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একজন ও তাঁত বোর্ডের দু’জন কর্মকর্তা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনে আরও তিনজন সদস্য এ বিশেষজ্ঞ দলে কাজ করছেন।
সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সভাকক্ষে বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মনজুর হোসেন, তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আস্রাফ আলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, ইতিমধ্যে মসলিনের ৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মসলিন তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন তা উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
সম্ভাব্য ফুটি কার্পাস তুলার চাষাবাদ শুরু করা হয়েছে, সূক্ষ্ম সুতা দ্বারা মসলিনের অনুরূপ সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি এবং হ্যান্ড স্পিনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম সুতা তৈরির অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফুটি কার্পাসের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘মসলিন বিলুপ্ত হয়েছে অন্তত ৩০০ বছর আগে। মসলিনের সেই সোনালি ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিষয়টি দেখভাল করছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।
মসলিন তৈরির অগ্রগতির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. মনজুর বলেন, ইতিমধ্যে আমরা কিছু তুলার জাতের সন্ধান পেয়েছি। যে তুলা দিয়ে মসলিনের সুতা তৈরি করা হতো। বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে। আশা করছি, শিগগির ওই সুতা দিয়ে শাড়ি বা স্কার্ফ তৈরি করতে পারব।
এরপর পর্যায়ক্রমে তৈরি করা হবে পরিধেয় নানা বস্ত্র।’ বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার (১ম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আইয়ুব আলী জানান, ‘প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদকালেই হারানো ঐতিহ্যবাসী মসলিন কাপড় তৈরি করতে সক্ষম হব ইনশাল্লাহ।’ সূত্র মতে, ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হতো। এটি ঢাকাই মসলিন নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের সোনারগাঁ অঞ্চলে চড়কা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিু ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার হতো। যার ফলে মসলিন হতো কাচের মতো স্বচ্ছ। এই মসলিন রাজকীয় পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হতো।
প্রায় ২৮ প্রকারের মসলিনের মধ্যে জামদানি এখনও ব্যাপক আকারে প্রচলিত। নানা কারণে আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। কথিত আছে যে মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সূক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেত।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা বস্ত্রের ওপরে ৭০-৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে তৈরি করা আমদানিকৃত কাপড়ের ওপরে মাত্র ২-৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁত শিল্পে ধস নামে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























