অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ভিক্ষা ছাড়লেই লাখপতি । কথাটা একটু অবিশ্বাস্য শোনালেও বাস্তবেই এ কাজ করে অসছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।প্রকৃত ভিক্ষুককে স্বনির্ভর করতে তাদের এ টাকা দিয়ে গাভী, হাসমুরগি কিংবা তাদের পছন্দ অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করছেন পিকেএসএফ। যেগুলো দিয়ে তারা প্রতি মাসে পাঁচ হাজারের বেশি আয় করছে। আর এ এক লাখ টাকা পাওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে জীবনে আর কখও ভিক্ষা করা যাবে না।এবছর জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৬৭ জন ভিক্ষুককে পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা করেছে পিকেএসএফ।
পিকেএসএফ এর সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ দৈনিক আকাশকে বলেন, দারিদ্র দূরীকরণের লক্ষ্যে দরিদ্র পরিবারসমূহের সম্পদ ও সক্ষমাতা বৃদ্ধি (সমৃদ্ধি) একটি মানবকেন্দ্রিক কর্মসূচি। আমাদের লক্ষ হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের মর্যদা প্রতিষ্ঠা করা। যে যেটা করতে চায় তার পাশে সে কাজের জন্য দাড়ানো হয়।যারা পিছিয়ে আছে তাদের দিকে নজর দেই আমরা। (৮৫০)সাড়ে আটশর মতো উদ্যোমী সদস্যদের (ভিক্ষুক) পাশে দাড়িয়েছি। তার মধ্যে মাত্র একজন টাকা ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেছে, আমি এটা করতে পারবো না হাত পাতলে এর চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যায়।এক লাখ টাকাই ফেরত দিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর ১৯ জন যেভাবে স্বাবলম্বি হওয়ার কথা সেভাবে হতে পারে নি। আর সবাই স্বাবলম্বি হয়েছে। কেউ সমৃদ্ধ বাড়ি করেছে। আবার কেউ ব্যবসায়ী হয়েছে, কেউ জমি কিনে বাড়ি বানাচ্ছে। এদের তো আর ভিক্ষুক বলা উচিৎ না আমরা ভিক্ষুক বলিওনা তাদেরকে বলা হয় উদ্যোমী সদস্য।
পাঁচগাঁওয়ের এক নারীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন,পাঁচগাওয়ের এক উদ্যোমী নারীকে দোকান দিয়ে দিয়েছিলাম।তিনি দোকানের নাম রেখেছে ‘সমৃদ্ধি ফাস্টফুট’। আমি দেখতে গেলাম তাকে। আমাকে বললেন,স্যার আমার চেয়ারটায় বসেন একটা ছবি তুলি। বসলাম একটা ছবি তুললো।সিংহাসন আকারে চেয়ার। একজন জিজ্ঞাসা করলো আপনি সিংহাসন বানালেন কেন।তিনি বললেন, ‘সারা জীবনে চেয়ারে বসার শখছিল বসতে পারি নি। সুযোগ হয়েছে তাই বানালাম।এখন তিনি বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে ‘চাতাল ব্যবসা’ (ধান ভাঙ্গানোর মিল) করেন। পাঁচ বছর আগে ভিক্ষুক ছিলেন এখন তিনি পাকা বাড়ি বানাচ্ছে। এমন শত শত উদাহরণ আছে।
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক মূল স্রোতে আনার জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই সমৃদ্ধি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে পিকেএসএফ। এরমধ্যে অন্যতম হল ভিক্ষুকদের স্বাবলম্বী করা। এই উদ্যোগে বেশ সফলতা পাওয়া যচ্ছে।
ভিক্ষা ছেরে উদ্যোমী সদস্যর গল্প:-
জয়পুরহাট জেলার নিক্তিপাড়া গ্রামের সুফিয়া বেওয়া। যিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ভিক্ষাবৃত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। দৈনিক আকাশকে তিনি বলেন, দরিদ্র দিনমজুর পরিবারে জন্ম তার। অভাবের সংসারে ঠিক মতো খাবারও জুটত না। একটু বড় হওয়ার পর অন্যের বাড়িতে কাজ করার জন্য তাকে রেখে আসা হয়। এরপর মাত্র ১২ বছর বয়সে পাশের নিত্তিপাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন নামে এক ভ্যান চালকের সঙ্গে বিয়ে হয় সুফিয়ার। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে বিয়ের ছয় মাসের মাথায় স্বামীকে নিয়ে নিত্তিপাড়া গুচ্ছগ্রামে একটি জীর্ণ বেড়ার ঘরে আশ্রয় নেন।২০০২ সালে মকবুল পঙ্গু হলে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে সুফিয়ার। একপর্যায়ে সুফিয়া বেছে নেন ভিক্ষার পথ। সারাদিন ভিক্ষা করে মেয়ে ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলতে থাকে সংসার। ২০০৮ সালে মকবুল মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ে সখিনাকে নিয়ে খুব বিপদে পড়েন।এরপর একজন দিনমজুরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। মেয়ে মেয়ের স্বামীকে নিয়ে আরও বিপদে পড়েন।সংসারে খরচ যায় আরও বেড়ে। ২০১৫ সালে পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) তত্ত্বাবধানে সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় ধলাহার ইউনিয়নের ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে তাকে যুক্ত করা হয়। এরপরই সুফিয়া দেখতে থাকেন সমৃদ্ধির পথ।
সুফয়ার বাড়ি ঘুরে দেখা য়ায় সুন্দর গোছানো বাড়ি।পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন। বাড়ির প্রবেশ পথে ‘ছুইয়ের’ মত সুন্দর একটি গেট। গেটের মাচার উপরে শাক এর জন্য আরও সুন্দর লাগছে।মনে হচ্ছে গ্রামীন বিয়ে বাড়ির গেট। একটু আগালেই উঠান । এর পাসে কবুতরের ঘর। অন্য পাসে কেঁচো সার প্রদর্শনি প্লান্ট। বসত ঘরের একটু পাশে গরুর ঘর। বাড়ির চারদিকে বিভিন্ন ফলের গাছ। উঠানের এক পাশে একটি খুটিতে আটকানো ব্যনারে লেখা উদ্যোমী সদস্য পুনর্বাসন কর্মসূচি। উদ্যমি সদস্যের নাম ‘সুফিয়া বেওয়া।পুনর্বাসনের সময় ২০১৫ সাল। অবকাঠামো উন্নয়নে ২৫ হাজার ৯৭৮ টাকা, বাছুরসহ গাভী ৬০ হাজার ৮১০ টাকা, মুরগী ১৫ হাজার টাকার, কবুতর ৫২০ টাকার, ভরণ পোষণ ও নগদ প্রদান ১৬ হাজার ১৯২ টাকা। মোট একলক্ষ পাঁচ হাজার টাকা।আর ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে বাছুরসহ গাভী ও ছাগল এক লক্ষ ২৭ হাজার টাকা, কবুতর চার হাজার ৭৫০, জমি লিজ ৩০ হাজার টাকা।সঞ্চয় ১৫ হাজার টাকা, অবকাঠামো ২২ হাজার টাকা। মোট দুই লক্ষ ২৭ হাজার ৫০ টাকা। বাস্তবাযনে জাকস ফাউন্ডেশন। অর্থায়নে সমৃদ্ধি কর্মসূচি পিকেএসএফ।
সুফিয়া জানান, এখন দুটি গাভিতে প্রতিদিন পাঁচ কেজি দুধ হয়। ওই দুধ বিক্রি করে মাসিক আয় আসে ৫ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া মুরগী, কবুতর, বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষ থেকে আয় হয় তার। বর্তমানে সুফিয়ার বাড়িটি একটি সুন্দর সমৃদ্ধ বাড়ি।
জয়পুরহাটের ধলারহার ইউনিয়নের শেখপাড়ার
আবু বক্করও ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন ২০ বছর। তিনি বলেন, প্রতিবেশীর কোন অনুষ্ঠান হলে দাওয়াত দিত না। কিন্তু এখন দেয় সন্মান করে।তিনি দৈনিক আকাশকে বলেন, ২০১৫ সালে আমাকে প্রজনন সেন্টার দিতে সহায়তা করেন পিকেএসএফ। দুইটা ষাঁড় ও একটি পাঠা দিয়ে প্রজনন কাজ করা হয়। ছাগল প্রজনন করতে একশন টাকা ও গরু প্রজনন করতে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা নেয়া হয়। চীনা হাঁস ও রাজহাঁস পালন করি আমি। স্যারেরা নিয়মিত পরামর্শ দেন।পরিবার নিয়ে আমি ভালো আছি। আমাকে দেখে অনেকে উৎসাহিত হচ্ছে কাজ করতে।
আবু বক্করের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক পাশে প্রজনন সেন্টার। আরেক পাসে বাঁশের খাচার ভেতরে কয়েকটি রাজহাঁস।মাটির ঘরে সাথে সেটে দেয়া একটি ব্যানারে লেখা ২০১৫ সনে পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু হয় তার। তখন তাকে অবকাঠামো উন্নয়নে ২২ হাজার ৫১২ টাকা , ষাঁড় ক্রয় ৬৬ হাজার ৫৪০ টাকা, মুরগী কিনে দেয়া হয় এক হাজার ৫০০ টাকার, কবুতর ৫২০ টাকা, ভরণ পোষণ ও নগদ প্রদান ১৩ হাজার ৯২৮ টাকা মোট এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকা।
যেটা ২০১৭ তে বেড়ে হয়েছে- ষাঁড় এক লাখ ২০ হাজার টাকা, হাঁস-মুরগী সাত হাজার ৭৫০ টাকা, কবুতর ৫ হাজার ২০০ টাকা, জমিও পুকুর লিজ ৩৫ হাজার টাকা, অবকাঠামো ২০ হাজার টাকা, সঞ্জয় পাঁচ হাজার টাকা।মোট এক লাখ ৯২ হাজার ৯৫০ টাকা।
যেখাবে পরিচালিত হয় ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রম:-
জনগণের টেকসই দারিদ্র দূরীকরণ ও সামগ্রিক উন্নয়নে লক্ষ্যে পরিবার ও ইউনিয়নভিক্তিক পরিকল্পনা তৈরি করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে পিকেএসএফ। তার মধ্যে ভিক্ষুক পুর্নবাসন কার্যক্রম অন্যতম। সমৃদ্ধি কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে ২০০টি ইউনিয়ন রয়েছে। সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতাভুক্ত প্রতি ইউনিয়ন থেকে বছরে দুই জন ভিক্ষুকের পুর্ণবাসনের লক্ষ রয়েছে বলে জানান পিকেএসএফের ডিএমডি (প্রশাসন) ড. মোঃ জসীম উদ্দিন ।
পিকেএসএফ সমৃদ্ধির আওতাভুক্ত ইউনিয়নসমূহকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।এবছর জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৬৭ জন ভিক্ষুককে পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা করেছে । প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জরিপ করে সকল ভিক্ষুকের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।প্রত্যেক ইউনিয়নের তালিকা থেকে বাছাই করে অধিকতর দু:স্থ ও অসহায় ভিক্ষুক পরিবারদেরকে অগ্রধিকার দিয়ে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি তালিকা প্রস্তুত করে। নির্বাচিত ভিক্ষুকদের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সত্যায়িত করে পিকেএসএফ-এর কাছে পাঠায়।পিকেএসএফ এর কর্মকর্তাগন মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে ভিক্ষুকদের তালিকা চূড়ান্ত করে।
এরপর পূনর্বাসনের জন্য চিহ্নিত প্রত্যেক ভিক্ষুক ও সহযোগী সংস্থার একজন কর্মকর্তার নামে যৌথ ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে প্রত্যেক ভিক্ষুকপ্রতি বরাদ্দ এক লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়। পরবর্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ভিক্ষুক ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলোচনাকরে আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম নির্ধাণ করে উপকরণ ক্রয় করা হয়। এছাড়াও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত রাখার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় কিছু খাদ্যদ্রব্য ক্রয় এবং আয়বৃদ্ধিমূলক –কার্যক্রম পরিচালনার প্রাথমিক বাড়তি খরচের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ টাকা প্রদান করা হয়।ঝুঁকি যেন না থাকে এ জন্য আয়ের একাধিক উৎসে বিনিয়োগ করা হয়।পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় আন্তভূক্ত পরিবার যাতে পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে না যায় বা আয়বৃদ্ধিমূলক উপকরণ বিক্রয় করতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রামের একজন ব্যক্তিকে স্থানীয় অভিভাবক নির্বাচন করা হয়।
আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম থেকে নিরবচ্ছিন্ন আয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থা নিয়মিত ফলোআপ ও মনিটরিং করে। এছাড়াও পুনর্বাসিত প্রতিটি পরিবারের দৈনিক আয় ও ব্যয় লিখে রাখা হয়। যেটা সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংস্থার শাখাকার্যালয়ে ও পরিবারে একটি কপি থাকে। যা সকল পরিবারের জন্য একটি রেজিস্টারে আলাদা আলাদ ভাবে সংরক্ষণ করা হয়। মাসিক অগ্রহতি প্রতিবেদন পিকেএসএফ-এ নিয়মিত পাঠানো হয়।
পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের মধ্যে ২০১৬ সালে ৬০০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পিকেএসএফ। সেখাতে তারা দেখে প্রত্যেকের গড় আয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা এবং উদ্যোমী সদস্য (ভিক্ষুক) প্রতি গড় সম্পত্তির পরিমান দেড় লক্ষ টাকা।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠা করে। আর সমৃদ্ধি কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালে।বর্তমানে দেশের ২০০ টি ইউনিয়নে এই কার্যক্রম রয়েছে।
প্রসঙ্গত আজ বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ)রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান দেশে ৬ লক্ষ পেশাদার ভিক্ষুক আছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























