ঢাকা ১২:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রকাশ হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল উদ্ধার হলো সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি জাপানি বিনিয়োগের জন্য পাঁচ খাত চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী ড্যাবের বিরুদ্ধে: কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের দেশে হাম ও উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্র করছে গুপ্তরা: ডিএনসিসি প্রশাসক ডেঙ্গুতে একদিনে ১১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত দুই হাজার ছাড়াল ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের উদ্বেগ রূপপুরের জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল রাশিয়ার কার্গো বিমান

কংগ্রেসে বড় ব্যবধানে জয় ডেমোক্র্যাটদের: ট্রাম্পের জন্য কি তবে শেষ শুরু?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৈরি করা ‘লাল দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক বলয় এবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

কট্টর রিপাবলিকান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সুনামি বয়ে গেছে, যা ট্রাম্পের বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর এক বিশাল আঘাত। এই বিপর্যয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ভোটাররা ট্রাম্পের নীতির প্রতি চরম অনীহা প্রকাশ করছেন এবং তাঁর দল আগের মতো শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময় জুড়ে ট্রাম্প ভোটারদের কাছে নিজের নামকে ব্যালটের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রায় ৪৭ বার জনসভায় বলেছিলেন, ‘আপনারা মনে করবেন ব্যালটে আমিই আছি। তবে ভোটাররা তাঁর কথা শুনেছেন ভিন্নভাবে—ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানানোর বদলে তারা তাঁর অজনপ্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যাঁদের ওপর ভর করে ট্রাম্প একাধিকবার হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন তিনি। তবে এ কথা তিনি একবার বা দুবার নয়, ঠিক ৪৭ বার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এই সুনামি এক দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে রাজত্ব করা এক চরম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের মুখ থুবড়ে পড়ারই চিত্র তুলে ধরেছে। পূর্বসূরিদের চেয়েও বেশি ট্রাম্প নিজের কাঁধে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন, আর শেষ পর্যন্ত তারই খেসারত দিতে হলো তাঁকে। নির্বাচনে প্রার্থী, আলোচনার ইস্যু, কৌশল ও মূল বক্তব্য—সবই ঠিক করেছিলেন তিনি। আর কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় নিজের ব্যবসা ও আয়রোজগার–সংক্রান্ত নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে তিনি বারবার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা ভোটারদের মনে দুর্নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কট্টর ‘রেড স্টেটগুলোতে’ অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থী—টেক্সাসের কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যারোলাইনার ডারলিন গ্রাহামের পরাজয় তাঁর হস্তক্ষেপের পরিণতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ ছাড়া ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া আমদানি শুল্কের নীতির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। অনেক ভোটারের জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার বদলে তিনি রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সমাপনী ভাষণ দেন, যেখানে তিনি শেওলা ও পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন। নির্বাচনের আগের দিন ট্রাম্প যেভাবে সময় কাটিয়েছেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় তাঁর রাজনৈতিক মনোভাব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যহীন ছিল। ভোটাররা কিসে বিরক্ত হচ্ছেন সেই সতর্কসংকেত থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রিয় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রতি তাঁর মোহ বাস্তবতার এক চরম স্মারক হিসেবে দেখা দেয়—যেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঠিক আগে রিচার্ড এম নিক্সন ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর। তাঁর সহযোগীরাও তাঁকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই বড় ঢেউ থেকে বড় কোনো শিক্ষা নেওয়ার বা আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে এক মৌলিক পরিবর্তনের রূপান্তর ঘটেছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক।

ঐতিহাসিক পরাজয় ও পরিসংখ্যান

  • প্রতিনিধি পরিষদের সামগ্রিক ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশের ব্যবধান গড়েছে।
  • দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালের পর এটি কংগ্রেসে কোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড।
  • ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার সময়ে রিপাবলিকানরা যে ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছিল, এবার ডেমোক্র্যাটরা সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও আসন পুনর্নির্ধারণ বা জেরিমানারিংয়ের কারণে সব ভোট আসন সংখ্যায় প্রতিফলিত নাও হতে পারে, তবুও এই জনরায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট বার্তা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের আমলের হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস সসনিক এই ফলাফলকে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির নীতিমালার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আজকের এই দিনটি মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন মোড়, যেখানে আগামী দুই বছর চরম অস্থিরতা অপেক্ষা করছে। যাঁরা একসময় পরিবর্তনের আশায় রাজনীতি-বহির্ভূত এই ব্যক্তির ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাঁরা এবার হয় তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, না হয় ভোটদান থেকেই বিরত থেকেছেন। আসন পুনর্নির্ধারণের কারণে অবশ্য এই বিপুল ভোটের ব্যবধান হয়তো অতীত ঐতিহাসিক বছরগুলোর মতো সমপরিমাণ আসনে রূপান্তরিত না-ও হতে পারে। তাঁরা সীমান্ত বন্ধের আশা করলেও বছরের পর বছর ধরে দেশে বাস করা মানুষদের ওপর যেভাবে কঠোর গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছে, তা তাঁরা মেনে নিতে পারেননি।

ট্রাম্পের আত্মপক্ষ সমর্থন ও বাস্তবতা

নির্বাচনে হারের পর ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই পরাজয় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রায় নয়। তিনি নিজেকে ব্যালটে অনুপস্থিত উল্লেখ করে বলেন, তিনি সরাসরি প্রার্থী না থাকায় পর্যাপ্ত ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। অথচ, রিপাবলিকানদের পুরো প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ট্রাম্প নিজেই। অনেক দলীয় নেতাও মনে করছেন, ট্রাম্পের এই যুক্তি হাস্যকর। দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে শতভাগ আনুগত্যের দাবি এবং তাঁর নিজের বিতর্কিত বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কর্মকাণ্ড রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া, ইরানের সঙ্গে অযাচিত সামরিক উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম এবং মুনাফাখোরির অভিযোগ ভোটারদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। কারণ, ‘কৃত্রিমভাবে সীমানা বিন্যাসের ফলে প্রতিপক্ষ দলের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। মঙ্গলবার রাতে টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না; আর আমি ছিলাম না বলেই আমরা পর্যাপ্ত ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে টানতে পারিনি।’। তবে ট্রাম্পের এই দাবিতে খোদ রিপাবলিকানদের অনেকে ভুরু কুঁচকাবেন। কারণ, এই প্রচার পুরোটাই ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল।

ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

ভোটার জরিপকারীরা লক্ষ্য করেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে ট্রাম্পের উদাসীনতা ভোটারদের প্রতারিত বোধ করতে বাধ্য করেছে।

রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি প্রবক্তা ডেভিড ম্যাকইনটোশ জানিয়েছেন, দলের এখন উচিত পুরোনো নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে ফিরে আসা, যা ২০২৮ সালের নির্বাচনে কার্যকর হতে পারে। রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি প্রচারকারী সংস্থা ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশ বলেন, ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক বিদায়ের কথা বলেছেন এবং প্রতিবারই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। ডেভিড আরও বলেন, ‘সমাধান হলো রিপাবলিকানদের আবার আমাদের নীতিমালায় ফিরে যাওয়া। ২০২৮ সালে এভাবেই আমরা জয়ী হতে পারব।’।

তবে মিশিগানের সাবেক গভর্নর জেমস ব্ল্যানচার্ডের মতে, এই পরিবেশ ১৯৭৪ সালের ওয়াটারগেট পরবর্তী ডেমোক্র্যাটিক জোয়ারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

যদিও তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্প-পূর্ব যুগে ফিরে যাবে।

ডেমোক্র্যাটরা এবার ট্রাম্প বিরোধিতাকেই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা অভাবনীয় সাফল্য বয়ে এনেছে।

এখন ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাত্র দুই বছর সময় বাকি আছে, এই সময়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

তবে কংগ্রেস হাতছাড়া হওয়ার এই বড় ধাক্কা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি বিশাল সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাঁর অজেয় ভাবমূর্তিকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

ভোটারদের এই স্পষ্ট বার্তা ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের পথচলা কতটা কঠিন করবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কা কোচ: ফারহানের জার্সি আমার, হামজারটার জন্য বাকিরা মারামারি করুক

কংগ্রেসে বড় ব্যবধানে জয় ডেমোক্র্যাটদের: ট্রাম্পের জন্য কি তবে শেষ শুরু?

আপডেট সময় ১০:২১:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৈরি করা ‘লাল দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক বলয় এবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

কট্টর রিপাবলিকান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সুনামি বয়ে গেছে, যা ট্রাম্পের বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর এক বিশাল আঘাত। এই বিপর্যয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ভোটাররা ট্রাম্পের নীতির প্রতি চরম অনীহা প্রকাশ করছেন এবং তাঁর দল আগের মতো শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময় জুড়ে ট্রাম্প ভোটারদের কাছে নিজের নামকে ব্যালটের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রায় ৪৭ বার জনসভায় বলেছিলেন, ‘আপনারা মনে করবেন ব্যালটে আমিই আছি। তবে ভোটাররা তাঁর কথা শুনেছেন ভিন্নভাবে—ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানানোর বদলে তারা তাঁর অজনপ্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যাঁদের ওপর ভর করে ট্রাম্প একাধিকবার হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন তিনি। তবে এ কথা তিনি একবার বা দুবার নয়, ঠিক ৪৭ বার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এই সুনামি এক দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে রাজত্ব করা এক চরম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের মুখ থুবড়ে পড়ারই চিত্র তুলে ধরেছে। পূর্বসূরিদের চেয়েও বেশি ট্রাম্প নিজের কাঁধে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন, আর শেষ পর্যন্ত তারই খেসারত দিতে হলো তাঁকে। নির্বাচনে প্রার্থী, আলোচনার ইস্যু, কৌশল ও মূল বক্তব্য—সবই ঠিক করেছিলেন তিনি। আর কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় নিজের ব্যবসা ও আয়রোজগার–সংক্রান্ত নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে তিনি বারবার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা ভোটারদের মনে দুর্নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কট্টর ‘রেড স্টেটগুলোতে’ অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থী—টেক্সাসের কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যারোলাইনার ডারলিন গ্রাহামের পরাজয় তাঁর হস্তক্ষেপের পরিণতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ ছাড়া ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া আমদানি শুল্কের নীতির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। অনেক ভোটারের জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার বদলে তিনি রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সমাপনী ভাষণ দেন, যেখানে তিনি শেওলা ও পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন। নির্বাচনের আগের দিন ট্রাম্প যেভাবে সময় কাটিয়েছেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় তাঁর রাজনৈতিক মনোভাব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যহীন ছিল। ভোটাররা কিসে বিরক্ত হচ্ছেন সেই সতর্কসংকেত থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রিয় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রতি তাঁর মোহ বাস্তবতার এক চরম স্মারক হিসেবে দেখা দেয়—যেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঠিক আগে রিচার্ড এম নিক্সন ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর। তাঁর সহযোগীরাও তাঁকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই বড় ঢেউ থেকে বড় কোনো শিক্ষা নেওয়ার বা আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে এক মৌলিক পরিবর্তনের রূপান্তর ঘটেছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক।

ঐতিহাসিক পরাজয় ও পরিসংখ্যান

  • প্রতিনিধি পরিষদের সামগ্রিক ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশের ব্যবধান গড়েছে।
  • দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালের পর এটি কংগ্রেসে কোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড।
  • ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার সময়ে রিপাবলিকানরা যে ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছিল, এবার ডেমোক্র্যাটরা সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও আসন পুনর্নির্ধারণ বা জেরিমানারিংয়ের কারণে সব ভোট আসন সংখ্যায় প্রতিফলিত নাও হতে পারে, তবুও এই জনরায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট বার্তা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের আমলের হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস সসনিক এই ফলাফলকে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির নীতিমালার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আজকের এই দিনটি মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন মোড়, যেখানে আগামী দুই বছর চরম অস্থিরতা অপেক্ষা করছে। যাঁরা একসময় পরিবর্তনের আশায় রাজনীতি-বহির্ভূত এই ব্যক্তির ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাঁরা এবার হয় তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, না হয় ভোটদান থেকেই বিরত থেকেছেন। আসন পুনর্নির্ধারণের কারণে অবশ্য এই বিপুল ভোটের ব্যবধান হয়তো অতীত ঐতিহাসিক বছরগুলোর মতো সমপরিমাণ আসনে রূপান্তরিত না-ও হতে পারে। তাঁরা সীমান্ত বন্ধের আশা করলেও বছরের পর বছর ধরে দেশে বাস করা মানুষদের ওপর যেভাবে কঠোর গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছে, তা তাঁরা মেনে নিতে পারেননি।

ট্রাম্পের আত্মপক্ষ সমর্থন ও বাস্তবতা

নির্বাচনে হারের পর ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই পরাজয় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রায় নয়। তিনি নিজেকে ব্যালটে অনুপস্থিত উল্লেখ করে বলেন, তিনি সরাসরি প্রার্থী না থাকায় পর্যাপ্ত ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। অথচ, রিপাবলিকানদের পুরো প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ট্রাম্প নিজেই। অনেক দলীয় নেতাও মনে করছেন, ট্রাম্পের এই যুক্তি হাস্যকর। দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে শতভাগ আনুগত্যের দাবি এবং তাঁর নিজের বিতর্কিত বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কর্মকাণ্ড রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া, ইরানের সঙ্গে অযাচিত সামরিক উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম এবং মুনাফাখোরির অভিযোগ ভোটারদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। কারণ, ‘কৃত্রিমভাবে সীমানা বিন্যাসের ফলে প্রতিপক্ষ দলের কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। মঙ্গলবার রাতে টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না; আর আমি ছিলাম না বলেই আমরা পর্যাপ্ত ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে টানতে পারিনি।’। তবে ট্রাম্পের এই দাবিতে খোদ রিপাবলিকানদের অনেকে ভুরু কুঁচকাবেন। কারণ, এই প্রচার পুরোটাই ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল।

ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

ভোটার জরিপকারীরা লক্ষ্য করেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে ট্রাম্পের উদাসীনতা ভোটারদের প্রতারিত বোধ করতে বাধ্য করেছে।

রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি প্রবক্তা ডেভিড ম্যাকইনটোশ জানিয়েছেন, দলের এখন উচিত পুরোনো নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে ফিরে আসা, যা ২০২৮ সালের নির্বাচনে কার্যকর হতে পারে। রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি প্রচারকারী সংস্থা ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশ বলেন, ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক বিদায়ের কথা বলেছেন এবং প্রতিবারই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। ডেভিড আরও বলেন, ‘সমাধান হলো রিপাবলিকানদের আবার আমাদের নীতিমালায় ফিরে যাওয়া। ২০২৮ সালে এভাবেই আমরা জয়ী হতে পারব।’।

তবে মিশিগানের সাবেক গভর্নর জেমস ব্ল্যানচার্ডের মতে, এই পরিবেশ ১৯৭৪ সালের ওয়াটারগেট পরবর্তী ডেমোক্র্যাটিক জোয়ারের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

যদিও তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্প-পূর্ব যুগে ফিরে যাবে।

ডেমোক্র্যাটরা এবার ট্রাম্প বিরোধিতাকেই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা অভাবনীয় সাফল্য বয়ে এনেছে।

এখন ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাত্র দুই বছর সময় বাকি আছে, এই সময়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

তবে কংগ্রেস হাতছাড়া হওয়ার এই বড় ধাক্কা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি বিশাল সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাঁর অজেয় ভাবমূর্তিকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

ভোটারদের এই স্পষ্ট বার্তা ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের পথচলা কতটা কঠিন করবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।