ঢাকা ১১:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রকাশ হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল উদ্ধার হলো সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি জাপানি বিনিয়োগের জন্য পাঁচ খাত চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী ড্যাবের বিরুদ্ধে: কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের দেশে হাম ও উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্র করছে গুপ্তরা: ডিএনসিসি প্রশাসক ডেঙ্গুতে একদিনে ১১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত দুই হাজার ছাড়াল ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের উদ্বেগ রূপপুরের জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল রাশিয়ার কার্গো বিমান

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়: শিক্ষার সংকট ও আমাদের দায়

ছাত্রজীবন মানেই অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণের মোক্ষম সময়। প্রাচীনকাল থেকেই বলা হয়ে থাকে, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’। কিন্তু ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সেই প্রথাগত ধারণায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। ২২ বছরের ইতিহাসে এইচএসসি পরীক্ষার এমন ভয়াবহ ফল বিপর্যয় দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও হতবাক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, শুধু পাসের হারই কমেনি, বরং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ছোটবেলায় ছাত্রজীবন রচনা লেখার সময় সূচনা হিসেবে লিখেছিলাম, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’—অর্থাৎ অধ্যয়নই (পড়াশোনা) ছাত্রদের তপস্যা। বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময় ছাত্রজীবন, কারণ এ সময়ে সাধারণত সাংসারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না। ফলে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করে এবং দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ২২ বছরের মধ্যে এত বড় অবনতি দেশকে হতবাক করেছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষা: ফেল করা মানেই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়। এর মধ্য দিয়ে অনেকের পড়াশোনায় ভাটা পড়তে শুরু করে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে এবং অন্যান্য শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপক অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর যেখানে ৬৩ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল, এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ হাজারে।

মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় সাড়ে ১০ লাখ, যার মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। এছাড়া পাস না করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমে গেছে। এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করার বিষয়টি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি জাতীয় ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এ ধরনের ঘটনা ভাবনারও অতীত ছিল। অভিভাবকেরা জানতে পারলে তো রক্ষা ছিল না।

শিক্ষার এই অধঃপতনের পেছনে অবকাঠামোগত ত্রুটি, শিক্ষকস্বল্পতা ও পাঠদানের ঘাটতির পাশাপাশি আরও কিছু সামাজিক কারণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন ব্যবহার, অপরিণত বয়সে মুঠোফোন হাতে পাওয়া এবং অভিভাবক পর্যায়ে নজরদারির অভাব কিশোর সমাজকে এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এককথায়, বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার, কিছু অভিভাবকের প্রশ্রয় এবং সঠিক সময়ে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা না করা—এসব কিশোরসমাজকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত পথে যেতে উৎসাহিত করেছে। আমাদের নিজেদের দুটি চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ) পরিচালনার অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি আমার চোখে পড়ছে, তা হলো কিছু কিছু বাবা–মায়ের দায়িত্বহীনতা, শৈথিল্য ও সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া তাদের স্বাভাবিক। কলেজ থেকে যোগাযোগ করা হলে বেশির ভাগ পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এইচএসসির ফল ও শিক্ষার গলদ নিয়ে যেসব কথা না বললেই নয়।

পরিবার ও অভিভাবকের শৈথিল্য বর্তমানে শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হলেও অভিভাবকরা বরং সন্তানের পক্ষ নিচ্ছেন। এমনকি তাঁরা সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেও অবস্থান নেন।

এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ার প্রতি আগ্রহ কমছে এবং দায়িত্ববোধ লোপ পাচ্ছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ১৫ বছর ধরে আয়োজিত ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান অনুষ্ঠানে দেখেছি, স্থানীয় সেরা স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী অনেক শিক্ষার্থীও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ পায়নি। ১৫ বছর ধরে সেখানে আমার পিতার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি। সেখানে স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ১০০ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়।

এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানের চিত্রই স্পষ্ট করে।

প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মুঠোফোন আসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও মননশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতার কুফল হিসেবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষার এমন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষাতেও পড়বে। যদি এখনই এই পরিস্থিতির গভীরে গিয়ে সঠিক কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎই সংকটের মুখে পড়বে। এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। এসব প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলা এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করার দায়িত্ব অভিভাবকদের নিতে হবে। শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে একটি সুশিক্ষিত ও আলোকিত সমাজ গঠনে আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। কারণ, মেধাবী প্রজন্ম ছাড়া একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে, নতুবা এই বিপর্যয় আমাদের আগামী দিনের জন্য আরও বড় বিপদ বয়ে আনবে।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জে মিছিলের প্রস্তুতি: আ.লীগের চার কর্মী গ্রেপ্তার

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়: শিক্ষার সংকট ও আমাদের দায়

আপডেট সময় ০৯:০৯:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ছাত্রজীবন মানেই অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণের মোক্ষম সময়। প্রাচীনকাল থেকেই বলা হয়ে থাকে, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’। কিন্তু ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সেই প্রথাগত ধারণায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। ২২ বছরের ইতিহাসে এইচএসসি পরীক্ষার এমন ভয়াবহ ফল বিপর্যয় দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও হতবাক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, শুধু পাসের হারই কমেনি, বরং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ছোটবেলায় ছাত্রজীবন রচনা লেখার সময় সূচনা হিসেবে লিখেছিলাম, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’—অর্থাৎ অধ্যয়নই (পড়াশোনা) ছাত্রদের তপস্যা। বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময় ছাত্রজীবন, কারণ এ সময়ে সাধারণত সাংসারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না। ফলে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করে এবং দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ২২ বছরের মধ্যে এত বড় অবনতি দেশকে হতবাক করেছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষা: ফেল করা মানেই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়। এর মধ্য দিয়ে অনেকের পড়াশোনায় ভাটা পড়তে শুরু করে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে এবং অন্যান্য শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপক অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর যেখানে ৬৩ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল, এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ হাজারে।

মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় সাড়ে ১০ লাখ, যার মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। এছাড়া পাস না করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমে গেছে। এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করার বিষয়টি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি জাতীয় ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এ ধরনের ঘটনা ভাবনারও অতীত ছিল। অভিভাবকেরা জানতে পারলে তো রক্ষা ছিল না।

শিক্ষার এই অধঃপতনের পেছনে অবকাঠামোগত ত্রুটি, শিক্ষকস্বল্পতা ও পাঠদানের ঘাটতির পাশাপাশি আরও কিছু সামাজিক কারণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন ব্যবহার, অপরিণত বয়সে মুঠোফোন হাতে পাওয়া এবং অভিভাবক পর্যায়ে নজরদারির অভাব কিশোর সমাজকে এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এককথায়, বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার, কিছু অভিভাবকের প্রশ্রয় এবং সঠিক সময়ে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা না করা—এসব কিশোরসমাজকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত পথে যেতে উৎসাহিত করেছে। আমাদের নিজেদের দুটি চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ) পরিচালনার অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি আমার চোখে পড়ছে, তা হলো কিছু কিছু বাবা–মায়ের দায়িত্বহীনতা, শৈথিল্য ও সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া তাদের স্বাভাবিক। কলেজ থেকে যোগাযোগ করা হলে বেশির ভাগ পিতা-মাতা বা অভিভাবকের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এইচএসসির ফল ও শিক্ষার গলদ নিয়ে যেসব কথা না বললেই নয়।

পরিবার ও অভিভাবকের শৈথিল্য বর্তমানে শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হলেও অভিভাবকরা বরং সন্তানের পক্ষ নিচ্ছেন। এমনকি তাঁরা সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেও অবস্থান নেন।

এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ার প্রতি আগ্রহ কমছে এবং দায়িত্ববোধ লোপ পাচ্ছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ১৫ বছর ধরে আয়োজিত ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান অনুষ্ঠানে দেখেছি, স্থানীয় সেরা স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী অনেক শিক্ষার্থীও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ পায়নি। ১৫ বছর ধরে সেখানে আমার পিতার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি। সেখানে স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ১০০ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়।

এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মানের চিত্রই স্পষ্ট করে।

প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মুঠোফোন আসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও মননশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতার কুফল হিসেবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষার এমন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষাতেও পড়বে। যদি এখনই এই পরিস্থিতির গভীরে গিয়ে সঠিক কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎই সংকটের মুখে পড়বে। এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। এসব প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলা এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করার দায়িত্ব অভিভাবকদের নিতে হবে। শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে একটি সুশিক্ষিত ও আলোকিত সমাজ গঠনে আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। কারণ, মেধাবী প্রজন্ম ছাড়া একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে, নতুবা এই বিপর্যয় আমাদের আগামী দিনের জন্য আরও বড় বিপদ বয়ে আনবে।