দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনকে খরা ও লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা করতে বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জাতীয় জীবনে এই মেগা প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দূর হবে এবং বর্ষাকালে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একইসাথে মাটি ও পানির লবণাক্ততা কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর হবে, আবার অন্যদিকে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও নদী ভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই এটি বাংলাদেশের পানি, কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য অবশম্ভাবী একটি প্রকল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। নদীগুলোতে পলি মাটির স্তর পড়েও লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়। কৃষি জমিতে কৃষকরা সেচের পানি না পেয়ে মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে দেয়। এতে পানির স্তুর নিচে নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সনিক। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। মূলত বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকার নিশ্চয় সেগুলো বিবেচনা করেই এগোচ্ছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যারাজ চালু হলে মৎস্য উৎপাদন বছরে প্রায় আড়াই লাখ টন বৃদ্ধি পাবে। কৃষি উন্নয়ন, নৌ-চলাচল ও অন্যান্য খাতের অর্থনৈতিক সুফল মিলে বার্ষিক প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক এ সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। পানি না থাকায় নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যহত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার।
উল্লেখ্য, ১৯৭০-এর দশকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে ওই অঞ্চলগুলোতে ফ্রেশ পানির সর্বচ্চ সরবরাহ ও প্রবাহ।
এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে এবং পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পায়। পরিবেশের এই বিরূপ পরিবর্তনে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আগামী ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলায় এই ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের ওপরও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরই মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার (পদ্মা) পানি বণ্টন চুক্তরে মেয়াদও আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন করা হয়েছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকার এর জন্য ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার পুরো অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল অবকাঠামো রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় নির্মিত হবে। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে ও ১৮টি আন্ডার সলুইস বা তলদেশ নির্গমন পথ থাকবে। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা ও ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ (আন্ডারস্লুইস), দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ।
পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। এছাড়া হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার প্রবাহ পুনরুদ্ধার হবে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে এটি প্রধান ভূমিকা রাখবে। তখন বন্যার কবলে পড়ে এসব অঞ্চলের জনপদ।
নদীভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রতিবছর পদ্মার তীরে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার ভাঙনের শিকার হয়। নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ ও ব্যারাজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের কারণে গত দুই দশকে পদ্মা নদী বিধৌত বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে। বিশেষ করে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কমাতে এটি একটি বড় সম্ভাবনা। তবে নির্মাণের সময় নদীর ভূ-প্রকৃতি ও প্রবাহের বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে বলে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, এই ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এটি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালান। এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে।
প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের মতে, বর্তমানে পানির লবণাক্ততা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর পর ওই অঞ্চলে মানুষের বসবাসের যোগ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। সেই বিপর্যয় থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলার প্রায় ১২০টি উপজেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষকে রক্ষা করতেই এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























