এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় লক্ষ্য করা গেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন, আর অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২২ বছরের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। এইচএসসির ফলাফলে ২২ বছরে এত বড় অবনতি যেসব কারণে। এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শুরু, মানতে হবে যে যে নিয়ম।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। এবারের ফলাফল সেই নিম্নমুখী ধারাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম। এছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা গত বছরের ৬৩ হাজার ২১৯ থেকে কমে ৩৫ হাজার ৯৪৮-এ ঠেকেছে, যা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও কমে ৩৫ হাজার ৯৪৮-এ দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর ছিল ৬৩ হাজার ২১৯, এক বছরে ২৭ হাজারেরও বেশি হ্রাস। গত তিন বছরে পাসের হার তীব্রভাবে কমেছে—২০২৪ সালে ৭৫ দশমিক ৫৬ থেকে ২০২৫ সালে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে, আর এবার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে।
ফলাফলের এই বিপর্যয়ের পেছনে বহুমুখী কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ঢাকা বোর্ড বাদে অন্য প্রায় সব বোর্ডে বাধ্যতামূলক বিষয়ে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মোবাইল গেমস ও অনলাইন মিডিয়ায় আসক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, পড়াশোনায় ধারাবাহিকতার অভাব, পারিবারিক অস্বচ্ছলতা, মফস্বল এলাকায় শিক্ষক সংকট এবং শর্টকাট মানসিকতা এই পতনের অন্যতম কারণ। এছাড়া ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে না পারার বিষয়টি নজিরবিহীন। ইংরেজির মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক অকৃতকার্যের বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন; শুধু পরিসংখ্যান থেকে কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয়। তবে সংখ্যাগুলোর পেছনে তাকালে এমন কিছু কারণ সামনে আসে, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ফলাফলকে ‘খারাপ’ না বলে ‘বাস্তব’ চিত্র বলাই শ্রেয়। কঠোর মূল্যায়নের ফলে নকলের সুযোগ প্রায় বন্ধ থাকায় প্রকৃত মেধাবীরাই উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরীক্ষাপদ্ধতি সংস্কারের দাবি উঠেছে। প্রথম বর্ষ থেকেই বোর্ড বা চূড়ান্ত পরীক্ষা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, যাতে একটিমাত্র পরীক্ষার ওপর সম্পূর্ণ ফলাফল নির্ভর না করে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তবে দুই ধাপে পরীক্ষার প্রশাসনিক ব্যয় ও শিক্ষক সংকটের চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। এই পতন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাদানের মান, প্রশ্নের ধরন ও মূল্যায়নপদ্ধতি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয় নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা চলছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয়ক কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছেন তার ভিত্তিতেই এই ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয় সাধারণত বাধ্যতামূলক নয়তো ঐচ্ছিক; ‘ফেল করলে ক্ষতি নেই’ এমন হাইব্রিড কাঠামো প্রশাসনিকভাবে জটিল এবং ফলাফল গণনা ও ট্রান্সক্রিপ্ট পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষাপদ্ধতি সংস্কারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এইচএসসি স্তরে প্রথম বর্ষেও দ্বিতীয় বর্ষের মতো বোর্ড বা চূড়ান্ত পরীক্ষা চালু করা যেতে পারে, যেমনটি ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ে প্রচলিত এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ইতিমধ্যে বিদ্যমান। প্রথম বর্ষেই দুর্বলতা ধরা পড়লে সংশোধনের সুযোগ থাকে। তা ছাড়া দুবার বোর্ড পরীক্ষার জন্য দ্বিগুণ প্রশ্নপত্র, খাতা মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক ব্যয় প্রয়োজন, যা শিক্ষকসংকটের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জিং।
ইংরেজিতে দুর্বলতার বিষয়টি কাটাতে মৌখিক পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে। যেখানে স্পিকিং টেস্ট, স্টোরি টেলিং ও ফোনেটিকসসহ মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে অর্ধেক মৌখিক ও বাকিটা এমসিকিউ রাখা যেতে পারে। এটি ইংরেজি ভীতি দূর করতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে আইসিটি বিষয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে পাস না করলেও যেন মোট ফলে প্রভাব না পড়ে। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, এমন পদক্ষেপ প্রশাসনিকভাবে জটিল এবং এটি শিক্ষার্থীদের আইসিটির প্রতি অমনোযোগী করে তুলতে পারে, অথচ ডিজিটাল যুগে এটি একটি অপরিহার্য দক্ষতা। ইংরেজিতে শুধু লিখিত নয়, মৌখিক পরীক্ষাও রাখা যেতে পারে, স্পিকিং টেস্ট ২৫ নম্বর (ডায়ালগ, স্টোরি টেলিং, ফোনেটিকস, কনভারসেশন) এবং এমসিকিউ ২৫ নম্বর, মোট ৫০ নম্বর।
এই বিপর্যয় কেবল শিক্ষার্থীদের দায় নয়, এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন—এই বোধ তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, বরং শিক্ষার্থী ও অবকাঠামোর গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























