ভারতের নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে একটি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছে যে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া সংক্রান্ত তিনটি নির্দেশই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। হলফনামায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো সিদ্ধান্তই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার একা নেননি। কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতবিরোধের যে অভিযোগ উঠেছে, তা ভিত্তিহীন এবং অসত্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছোটখাটো মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তা বিরোধ বা বিভাজন নয় বলে কমিশন দাবি করেছে। জনসমক্ষে বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যা বলেছিল, সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা পেশ করে সেই কথাই তারা জানাল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এমন হয়েই থাকে। কিন্তু মতপার্থক্যের অর্থ মতবিরোধ নয়। বাদ পড়া ভোটারদের ফেরাচ্ছে ইসি, তাহলে বিজেপিকে জেতাতেই এত কিছু করলেন জ্ঞানেশ। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিলেন, তাঁরা কোনো অনুমতিই দেননি। ভারতের নির্বাচন কমিশনে অভাবনীয় দ্বন্দ্ব, শক্ত হলো বিরোধীদের হাত। ভারতে ইসি নিয়োগ বিলে বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন জগনমোহন, এখন অনুতপ্ত বলে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি।
কমিশন জানিয়েছে, এই হলফনামাটি তিন সদস্যের পূর্ণ সম্মতির ভিত্তিতেই আদালতে পেশ করা হয়েছে। গত সোমবার জমা দেওয়া এই হলফনামাটি ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে ওঠা বিভিন্ন মামলার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ মঙ্গলবার এই মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ তোলা হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। কমিশন এ কথাও জানাতে ভোলেনি, এই হলফনামাটিও তিন সদস্যের সম্মতিতে জমা দেওয়ার জন্য অনুমোদিত হয়েছে। এভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত কখনো কারও একার হয় না।
হলফনামার তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে এসআইআর সংক্রান্ত তিনটি নির্দেশ জারি করা হয়, যার প্রতিটিই সর্বসম্মত। কমিশনের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হয়। সিইসি বা কমিশনারদের কাছে নথি পৌঁছানোর পর আলোচনা সাপেক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। জরুরি প্রয়োজনে অনলাইনেও অনুমোদন নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে নথিবদ্ধ করা হয়। পরামর্শ বা পর্যবেক্ষণ জানতে চাওয়া হয়।
ভুল বোঝাবুঝির বিষয়ে কমিশন জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যক্তিগত নোট বা প্রশ্নকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। ফর্ম ৬-এর পরিবর্তনের বিতর্ক নিয়েও কমিশন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য আবেদনের সঙ্গে একটি আলাদা ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে আবেদনকারীকে ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় পূর্বপুরুষের নাম থাকার বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ফর্ম ৬-এর কোনো পরিবর্তন নয়, বরং একটি নতুন নথি মাত্র। এসআইআর বিতর্কে বড়ভাবে উঠে এসেছে ফর্ম ৬–এ পরিবর্তন ঘটানোর প্রশ্নটি। তাতে সংশ্লিষ্ট ভোটারের মা–বাবা, দাদা–দাদি কিংবা নানা–নানির নাম ২০০৩ সালে ভোটার তালিকায় ছিল কি না, তা জানাতে বলা হয়। সেই বদল ঘটানোর একমাত্র এখতিয়ার আছে কেন্দ্রীয় সরকারের।
কমিশন স্বীকার করেছে যে, অনলাইন আবেদনের ফরম্যাটে তথ্যের উপস্থাপনার কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন ফর্ম ৬-এ বদল আনা হয়েছে। তবে যারা পুরোনো তালিকায় নেই বা ম্যাপিং হয়নি, তাদের ব্যক্তিগতভাবে দপ্তরে আসার প্রয়োজন নেই বলে কমিশন নিশ্চিত করেছে। বুথ পর্যায়ের কর্মীরা বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং প্রয়োজনে অনলাইনে শুনানির ব্যবস্থা করা হবে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও নানা প্রশ্ন বিবেচনায় আনা হয়।
বিতর্কিত ‘ইসিআইনেট’ ব্যবস্থার বিষয়ে বলা হয়েছে, এতে সব ক্ষমতা নির্বাচন নিবন্ধন কর্মকর্তার (ইআরও) ওপর ন্যাস্ত।
গোয়ার ভোটার তালিকার বিষয়ে কমিশন জানায়, ৯৭ জনের মধ্যে ৮৮ জনের নাম ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়াও, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের কার্যকলাপে আপত্তি জানিয়ে দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে যে চিঠি দিয়েছিলেন, সেটিও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। দুই কমিশনারের যৌথ আপত্তির কারণে ডেপুটি কমিশনারের ওই বিতর্কিত নির্দেশিকা আর কার্যকর হয়নি।
হলফনামায় আরও জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরানোর যে আবেদন করা হয়েছে, তা আইনসিদ্ধ নয়। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া তাঁকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কোনো অভ্যন্তরীণ নথি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার অনুমতি কমিশন কাউকে দেয়নি বলেও হলফনামায় জানানো হয়েছে। তা ছাড়া বিহারের এসআইআরের সময় ওই প্রশ্নও ওঠেনি। সিইসি জ্ঞানেশকে তাঁর দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আবেদন খারিজ করে বলা হয়েছে, তা করতে হলে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের মতো তাঁকেও অভিশংসিত করতে হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















