ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের শান্তিতে নির্বাচন করতে দেব না: আসিফ মাহমুদ ‘আমি রুমিন ফারহানা, আমার কোনো দল লাগে না’ গুম হওয়া পরিবারের আর্তনাদ শুনে কাঁদলেন তারেক রহমান কালি নয়, জুলাই জাতীয় সনদ ‘রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে’ লেখা হয়েছে : আলী রীয়াজ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী ওসমানী মেডিকেলে ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলা, চলছে কর্মবিরতি নির্বাচন ব্যর্থ হলে শুধু সরকার নয়, পুরো দেশবাসীকেই এর ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে : দুদু আন্দোলনের সুফল একটি দলের ঘরে নেওয়ার চেষ্টা বিফলে যাবে : ডা. জাহিদ ঢাকাকে হারিয়ে প্লে-অফ নিশ্চিত করল রংপুর রাইডার্স খালেদা জিয়ার আদর্শই হবে আগামীর চালিকাশক্তি : খন্দকার মোশাররফ

দ্বিখণ্ডিত নবজাতক এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

আমি বরাবরই ডেসট্রাক্টিভ অপারেশনগুলো ভয় পাই। এগুলো দেখলে আমার ভেতরে কেমন যে অদ্ভুত কষ্ট হয়, আমি পারতপক্ষে এগুলো এড়িয়ে যাই। আমাদের ইউনিটে এই সাহসিক কাজটা করতেন শিপ্রা ম্যাডাম। গোদাগাড়ীর চর অঞ্চল থেকে প্রতি অ্যাডমিশনে একটা-দুইটা রোগী ভর্তি হয়, বাড়িতে তিন দিন চেষ্টা করে মৃত বাচ্চা অবস্ট্রাকশন করে নিয়ে আসে। বিশাল সাইজের পেট, ব্যথায় পরিশ্রান্ত রোগী, নিচে মরা বাচ্চার মাথা আটকে আছে। উপায় একটাই, বাচ্চার মাথা ফুটো করে ভেতরের সব মগজ বের করে মাথা ছোট হয়ে আসলে টেনে বাচ্চা বের করে নিয়ে আসা। এটাকে বলে ক্রেনিয়োটোমি।

উল্লেখিত কন্ডিশনে এটাই বইপত্রে উল্লিখিত চিকিৎসা। যে বাচ্চা মারা গেছে তাকে আস্ত বের করতে গিয়ে জ্যান্ত রোগীর ক্ষতি করার কোন ইথিক্স মেডিকেল সায়েন্সে শেখানো হয় না। অতি দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতেন শিপ্রা ম্যাডাম, সাহসী কেউ কেউ তাকে সাহায্য করতেন। আমি পালিয়ে বেড়াতাম। চেষ্টা করতাম, কোনোভাবেই যেন এই দৃশ্য আমার চোখে না পড়ে। ম্যাডাম আমাকে ভৎর্সনাও করতেন এ নিয়ে। আমি ম্যাডামের সব ভৎর্সনা উপেক্ষা করে দূরে দূরে থাকতাম।

একবার এমন একটা রোগী এল, কিন্তু তার বাচ্চার মাথা নেই সামনে, আছে ঘাড়। সেটার দায়িত্ব পড়ল ডটি আপার ঘাড়ে। ডটি আপা ডিক্যাপিটেশন করে রোগী বাঁচালেন। ডিক্যাপিটেশন হলো, মৃত বাচ্চার মাথা কেটে বাচ্চা দুভাগে ভাগ করে টেনে বের করে নিয়ে আসা। কাজটি করার সময় আমি অতি চতুরতার সঙ্গে অন্য দুজনকে ডটি আপার কাছে সেট করে পালিয়ে বাঁচলাম।

নওগাঁ অঞ্চলে বহুদিন ধরে অতিথি প্র্যাকটিস করার সুবাদে জানি, সে এলাকার লোকের পুরনো অভ্যাস, পেটের বাচ্চা পেলে-পুষে পাঁচ মাস পার হওয়ার পর সেটা নষ্ট করার অভিপ্রায় করা। সে রকমই এক রোগী কোনো এক তথাকথিত দাইয়ের কাছে বাচ্চা নষ্ট করতে গেল। দাই বরাবরের মতো ওষুধ দিয়ে জরায়ুর মুখ খানিকটা খুলে পানির থলে ফুটো করে দিল। বের হবি তো হ, ফুটো অংশ দিয়ে মাথার বদলে এল বাচ্চার হাত। অভিজ্ঞ (?) দাই (পড়তে হবে ডাক্তার) বাচ্চার হাতটা দিল খচাং করে কেটে। ব্যস, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগী মরতে বসল। এবার দাই ম্যাডাম বিচক্ষণতার সঙ্গে তাকে রেফার করে দিলেন রাজশাহী। সেই রোগীর পেট কেটে (হিসটারোটোমি) করে হাতবিহীন বাচ্চা বের করতে হলো, সঙ্গে রোগীর গায়ে দিতে হল ছয়-সাত ব্যাগ রক্ত। আমি বিকৃত জিনিস দেখব না বিধায় দূরে সরে থাকলাম।

এক অ্যাডমিশনে সন্ধ্যার পর এমনই আরেক রোগীকে নিয়ে এল গলাকাটা বাচ্চার লাশসহ। বক্তব্য অতি সাধারণ, বাচ্চা উল্টা এসেছিল, টানতে গিয়ে ধড় ছিঁড়ে এসেছে, মাথা জরায়ুর ভেতরে, ওটা বের করে দেন। নিচ দিয়ে বের করার প্রাণান্তকর চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে কৌশলে পেট কাটার কাজটা কলিগকে দিয়ে সরে থাকলাম। কলিগ জরায়ু কেটে বাচ্চার খণ্ডিত মাথা বের করে রোগীর জীবন বাঁচাল।

কিন্তু এত কৌশল অবলম্বন করেও আমার শেষ রক্ষা হল না। আফটার কামিং হেড অবস্ট্রাকশন করে নিয়ে চলে আসল একজন। অর্থাৎ শুদ্ধ বাংলায়, বাচ্চার মাথা ভেতরে আটকে গেছে, গলা থেকে পুরো শরীর বাইরে ঝুলছে, জরায়ুর মুখ বন্ধ এবং যথারীতি দাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মরণাপন্ন রোগী। ওয়ার্ডের দায়িত্ব আমার, আমি সিএ (অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার), কোনোভাবেই পালানোর কোনো পথ পেলাম না। আফটার কামিং হেড বের করার যত রকম পন্থা বই-পুস্তকে আছে সব চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম, এমনকি আমার সাধের ফরসেপ ব্লেডও সেট করতে পারলাম না। অবশেষে উপায়ান্তর না পেয়ে পেছন থেকে বাচ্চার মাথা ফুটো করে বাল্ক কমিয়ে মাথা বের করে রোগীটা বাঁচালাম।

এ ঘটনার পর আমি তিন দিন খেতে পারিনি। খেতে বসলেই ছোট মৃত শিশুটির মগজগুলো চোখের সামনে ভেসে আসে, আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠে। আমি ১০০% শিউর, আমার অন্য সিনিয়র-জুনিয়র কলিগ, যারা এত দিন এমন ডেসট্রাক্টিভ অপারেশন করেছেন তারাও এমনই দু’চার-পাঁচ দিন খেতে পারেননি। তবুও করেছেন বারবার। তারা আমার মতো ভীতু নন, রোগী বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে অপছন্দের কাজটিও তারা করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। ইচ্ছা করলেই সোজাসুজি পেট কেটে আস্ত মরা বাচ্চা তারা বের করে দিতে পারতেন (যদিও সব ক্ষেত্রে নয়), কিন্তু একটা মরা বাচ্চার জন্য অযথা মরণাপন্ন রোগীর অপারেশন করে তারা রোগীর মরবিডিটির বাড়াতে চাননি। এখন দয়া করে জানতে চাইবেন না, মরবিডিটি কি? গুগল খুঁজে বের করে নেবেন। আপনারা আমাদের কসাই বলেন, ভালো বলেন, মন্দ বলেন, মহান বলেন, চামার বলেন, যা ইচ্ছা বলতে পারেন, আমাদের কিছুই এসে যায় না। আমাদের সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি আমাদের রোগীর জীবন। সেটা বাঁচানোর স্বার্থে আমরা সবচেয়ে অপ্রিয় কাজটি করে তিনদিন না খেয়ে থাকি, তাদের জীবন রক্ষার্থে কাজ করতে করতে দিনের পর দিন অসময়ে খেয়ে গ্যাস্ট্রিক আলসার করি, সময়-সুযোগ পাই না বলে প্রস্রাব আটকে রাখতে রাখতে ইউরিনে ইনফেকশন বাঁধায়, রোগী বাঁচাতে অভুক্ত অবস্থায় নিজের গায়ের রক্ত দিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়, এমনই আরও অনেক ঘটনা আমাদের জীবনে ইতিহাস হয়ে থেকে যায়। আমরা আপনাদের কাছে ঢোল পিটিয়ে বলতে বের হই না, পত্রিকার পাতায় বীরত্বের গল্প ছাপানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠি না। কারণ, আমরা জানি, আমাদের বীরত্ব, আমাদের মহানুভবতা, আমাদের সীমাবদ্ধতা বোঝার মতো শিক্ষিত জাতিতে আমাদের জন্ম হয়নি।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কেন এতক্ষণ ধরে এ স্তুতিগান? সত্যি বলতে কি নিজেদের জয়গান গাওয়ার জন্য এ ক্ষুদ্র প্রয়াসের অবতারণা করিনি ভাই। সম্প্রতি, দ্বিখণ্ডিত নবজাতকের নাটকীয়তা করে কুমিল্লায় অবস্ট্রেটিশিয়ানকে আদালতে ডেকে হয়রানির কথা শুনে মনের ভেতরটা বড় খচখচ করছিল। হাজার হলেও সমগোত্রীয় কিনা ! আর কিছু করার ক্ষমতা যেহেতু নেই, তাই দু’কলম লিখতে বসলাম আর কি ! কিই বা আর করব বলুন, আমরা তো জানিই আমাদের সীমাবদ্ধতা।

আমরা জানি, কথা বলার জন্য এ জাতির জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, অভিযোগ করার জন্য এ জাতির বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, আমাদের গায়ে যখন তখন হাত তোলার জন্য এ জাতির কোনো আইনের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, সংবাদ পরিবেশনের জন্য এ জাতির সংবাদের উপাত্ত বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য এ জাতির বস্তুনিষ্ঠ কোনো অপরাধের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, খুব ভালো করেই জানি। তারপরেও জেনেশুনে, সব অভিযোগ মাথায় নিয়ে, সব অনুযোগ হজম করে, সব রিস্ক মাথায় নিয়েই আমরা এই অকৃতজ্ঞ দায়িত্বহীন জাতির চিকিৎসা করে চলেছি দায়িত্বের সাথে, কৃতজ্ঞ চিত্তে। কেন জানেন? কারণ, আমরা জানি আমাদের সীমাবদ্ধতা।

আমরা সেই অশিক্ষিত সমাজে কষ্ট করে কিঞ্চিৎ শিক্ষা নিয়ে একখানা এমবিবিএস ডিগ্রি ধারণ করা ডাক্তার, যেখানে রোগীরা আমাদের দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে, কোয়াক দিয়ে ভেরিফাই করে, ওষুধ গ্রহণ করে ওষুধের দোকানদারের পরামর্শমতো।

লিখেছেন: ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস ; এফসিপিএস(গাইনী); ফিগো ফেলো (ইতালি), গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।

সূত্র: মেডিভয়েস

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের শান্তিতে নির্বাচন করতে দেব না: আসিফ মাহমুদ

দ্বিখণ্ডিত নবজাতক এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা

আপডেট সময় ০৬:৪১:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল ২০১৮

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

আমি বরাবরই ডেসট্রাক্টিভ অপারেশনগুলো ভয় পাই। এগুলো দেখলে আমার ভেতরে কেমন যে অদ্ভুত কষ্ট হয়, আমি পারতপক্ষে এগুলো এড়িয়ে যাই। আমাদের ইউনিটে এই সাহসিক কাজটা করতেন শিপ্রা ম্যাডাম। গোদাগাড়ীর চর অঞ্চল থেকে প্রতি অ্যাডমিশনে একটা-দুইটা রোগী ভর্তি হয়, বাড়িতে তিন দিন চেষ্টা করে মৃত বাচ্চা অবস্ট্রাকশন করে নিয়ে আসে। বিশাল সাইজের পেট, ব্যথায় পরিশ্রান্ত রোগী, নিচে মরা বাচ্চার মাথা আটকে আছে। উপায় একটাই, বাচ্চার মাথা ফুটো করে ভেতরের সব মগজ বের করে মাথা ছোট হয়ে আসলে টেনে বাচ্চা বের করে নিয়ে আসা। এটাকে বলে ক্রেনিয়োটোমি।

উল্লেখিত কন্ডিশনে এটাই বইপত্রে উল্লিখিত চিকিৎসা। যে বাচ্চা মারা গেছে তাকে আস্ত বের করতে গিয়ে জ্যান্ত রোগীর ক্ষতি করার কোন ইথিক্স মেডিকেল সায়েন্সে শেখানো হয় না। অতি দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতেন শিপ্রা ম্যাডাম, সাহসী কেউ কেউ তাকে সাহায্য করতেন। আমি পালিয়ে বেড়াতাম। চেষ্টা করতাম, কোনোভাবেই যেন এই দৃশ্য আমার চোখে না পড়ে। ম্যাডাম আমাকে ভৎর্সনাও করতেন এ নিয়ে। আমি ম্যাডামের সব ভৎর্সনা উপেক্ষা করে দূরে দূরে থাকতাম।

একবার এমন একটা রোগী এল, কিন্তু তার বাচ্চার মাথা নেই সামনে, আছে ঘাড়। সেটার দায়িত্ব পড়ল ডটি আপার ঘাড়ে। ডটি আপা ডিক্যাপিটেশন করে রোগী বাঁচালেন। ডিক্যাপিটেশন হলো, মৃত বাচ্চার মাথা কেটে বাচ্চা দুভাগে ভাগ করে টেনে বের করে নিয়ে আসা। কাজটি করার সময় আমি অতি চতুরতার সঙ্গে অন্য দুজনকে ডটি আপার কাছে সেট করে পালিয়ে বাঁচলাম।

নওগাঁ অঞ্চলে বহুদিন ধরে অতিথি প্র্যাকটিস করার সুবাদে জানি, সে এলাকার লোকের পুরনো অভ্যাস, পেটের বাচ্চা পেলে-পুষে পাঁচ মাস পার হওয়ার পর সেটা নষ্ট করার অভিপ্রায় করা। সে রকমই এক রোগী কোনো এক তথাকথিত দাইয়ের কাছে বাচ্চা নষ্ট করতে গেল। দাই বরাবরের মতো ওষুধ দিয়ে জরায়ুর মুখ খানিকটা খুলে পানির থলে ফুটো করে দিল। বের হবি তো হ, ফুটো অংশ দিয়ে মাথার বদলে এল বাচ্চার হাত। অভিজ্ঞ (?) দাই (পড়তে হবে ডাক্তার) বাচ্চার হাতটা দিল খচাং করে কেটে। ব্যস, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগী মরতে বসল। এবার দাই ম্যাডাম বিচক্ষণতার সঙ্গে তাকে রেফার করে দিলেন রাজশাহী। সেই রোগীর পেট কেটে (হিসটারোটোমি) করে হাতবিহীন বাচ্চা বের করতে হলো, সঙ্গে রোগীর গায়ে দিতে হল ছয়-সাত ব্যাগ রক্ত। আমি বিকৃত জিনিস দেখব না বিধায় দূরে সরে থাকলাম।

এক অ্যাডমিশনে সন্ধ্যার পর এমনই আরেক রোগীকে নিয়ে এল গলাকাটা বাচ্চার লাশসহ। বক্তব্য অতি সাধারণ, বাচ্চা উল্টা এসেছিল, টানতে গিয়ে ধড় ছিঁড়ে এসেছে, মাথা জরায়ুর ভেতরে, ওটা বের করে দেন। নিচ দিয়ে বের করার প্রাণান্তকর চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে কৌশলে পেট কাটার কাজটা কলিগকে দিয়ে সরে থাকলাম। কলিগ জরায়ু কেটে বাচ্চার খণ্ডিত মাথা বের করে রোগীর জীবন বাঁচাল।

কিন্তু এত কৌশল অবলম্বন করেও আমার শেষ রক্ষা হল না। আফটার কামিং হেড অবস্ট্রাকশন করে নিয়ে চলে আসল একজন। অর্থাৎ শুদ্ধ বাংলায়, বাচ্চার মাথা ভেতরে আটকে গেছে, গলা থেকে পুরো শরীর বাইরে ঝুলছে, জরায়ুর মুখ বন্ধ এবং যথারীতি দাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মরণাপন্ন রোগী। ওয়ার্ডের দায়িত্ব আমার, আমি সিএ (অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার), কোনোভাবেই পালানোর কোনো পথ পেলাম না। আফটার কামিং হেড বের করার যত রকম পন্থা বই-পুস্তকে আছে সব চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম, এমনকি আমার সাধের ফরসেপ ব্লেডও সেট করতে পারলাম না। অবশেষে উপায়ান্তর না পেয়ে পেছন থেকে বাচ্চার মাথা ফুটো করে বাল্ক কমিয়ে মাথা বের করে রোগীটা বাঁচালাম।

এ ঘটনার পর আমি তিন দিন খেতে পারিনি। খেতে বসলেই ছোট মৃত শিশুটির মগজগুলো চোখের সামনে ভেসে আসে, আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠে। আমি ১০০% শিউর, আমার অন্য সিনিয়র-জুনিয়র কলিগ, যারা এত দিন এমন ডেসট্রাক্টিভ অপারেশন করেছেন তারাও এমনই দু’চার-পাঁচ দিন খেতে পারেননি। তবুও করেছেন বারবার। তারা আমার মতো ভীতু নন, রোগী বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে অপছন্দের কাজটিও তারা করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। ইচ্ছা করলেই সোজাসুজি পেট কেটে আস্ত মরা বাচ্চা তারা বের করে দিতে পারতেন (যদিও সব ক্ষেত্রে নয়), কিন্তু একটা মরা বাচ্চার জন্য অযথা মরণাপন্ন রোগীর অপারেশন করে তারা রোগীর মরবিডিটির বাড়াতে চাননি। এখন দয়া করে জানতে চাইবেন না, মরবিডিটি কি? গুগল খুঁজে বের করে নেবেন। আপনারা আমাদের কসাই বলেন, ভালো বলেন, মন্দ বলেন, মহান বলেন, চামার বলেন, যা ইচ্ছা বলতে পারেন, আমাদের কিছুই এসে যায় না। আমাদের সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি আমাদের রোগীর জীবন। সেটা বাঁচানোর স্বার্থে আমরা সবচেয়ে অপ্রিয় কাজটি করে তিনদিন না খেয়ে থাকি, তাদের জীবন রক্ষার্থে কাজ করতে করতে দিনের পর দিন অসময়ে খেয়ে গ্যাস্ট্রিক আলসার করি, সময়-সুযোগ পাই না বলে প্রস্রাব আটকে রাখতে রাখতে ইউরিনে ইনফেকশন বাঁধায়, রোগী বাঁচাতে অভুক্ত অবস্থায় নিজের গায়ের রক্ত দিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়, এমনই আরও অনেক ঘটনা আমাদের জীবনে ইতিহাস হয়ে থেকে যায়। আমরা আপনাদের কাছে ঢোল পিটিয়ে বলতে বের হই না, পত্রিকার পাতায় বীরত্বের গল্প ছাপানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠি না। কারণ, আমরা জানি, আমাদের বীরত্ব, আমাদের মহানুভবতা, আমাদের সীমাবদ্ধতা বোঝার মতো শিক্ষিত জাতিতে আমাদের জন্ম হয়নি।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কেন এতক্ষণ ধরে এ স্তুতিগান? সত্যি বলতে কি নিজেদের জয়গান গাওয়ার জন্য এ ক্ষুদ্র প্রয়াসের অবতারণা করিনি ভাই। সম্প্রতি, দ্বিখণ্ডিত নবজাতকের নাটকীয়তা করে কুমিল্লায় অবস্ট্রেটিশিয়ানকে আদালতে ডেকে হয়রানির কথা শুনে মনের ভেতরটা বড় খচখচ করছিল। হাজার হলেও সমগোত্রীয় কিনা ! আর কিছু করার ক্ষমতা যেহেতু নেই, তাই দু’কলম লিখতে বসলাম আর কি ! কিই বা আর করব বলুন, আমরা তো জানিই আমাদের সীমাবদ্ধতা।

আমরা জানি, কথা বলার জন্য এ জাতির জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, অভিযোগ করার জন্য এ জাতির বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, আমাদের গায়ে যখন তখন হাত তোলার জন্য এ জাতির কোনো আইনের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, সংবাদ পরিবেশনের জন্য এ জাতির সংবাদের উপাত্ত বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য এ জাতির বস্তুনিষ্ঠ কোনো অপরাধের প্রয়োজন হয় না। আমরা জানি, খুব ভালো করেই জানি। তারপরেও জেনেশুনে, সব অভিযোগ মাথায় নিয়ে, সব অনুযোগ হজম করে, সব রিস্ক মাথায় নিয়েই আমরা এই অকৃতজ্ঞ দায়িত্বহীন জাতির চিকিৎসা করে চলেছি দায়িত্বের সাথে, কৃতজ্ঞ চিত্তে। কেন জানেন? কারণ, আমরা জানি আমাদের সীমাবদ্ধতা।

আমরা সেই অশিক্ষিত সমাজে কষ্ট করে কিঞ্চিৎ শিক্ষা নিয়ে একখানা এমবিবিএস ডিগ্রি ধারণ করা ডাক্তার, যেখানে রোগীরা আমাদের দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে, কোয়াক দিয়ে ভেরিফাই করে, ওষুধ গ্রহণ করে ওষুধের দোকানদারের পরামর্শমতো।

লিখেছেন: ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস ; এফসিপিএস(গাইনী); ফিগো ফেলো (ইতালি), গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।

সূত্র: মেডিভয়েস