বিনোদন অঙ্গনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার ক্রমাগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জাহ্নবী কাপুর, সুনয়না এবং কীর্তি সুরেশের মতো অভিনেত্রীদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে ডিপফেক কনটেন্ট তৈরির ঘটনা শিল্পীদের নিরাপত্তা ও নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট ও বড় করে সতর্কবার্তা যুক্ত করাকে আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভিএফএক্স বিশেষজ্ঞ সিবি অরুণ কুমার। তার মতে, এআইয়ের সব ধরনের ব্যবহারকে একসঙ্গে দোষারোপ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর আইনও জরুরি। যেমন শিল্পশিক্ষার্থীরা বড় শিল্পীদের কাজ দেখে ও অনুকরণ করে নিজেদের দক্ষতা বাড়ান।
হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পার্ল একাডেমির কমিউনিকেশন, ফিল্ম অ্যান্ড গেমিং বিভাগের ডিন সিবি অরুণ কুমার প্রযুক্তির এই নৈতিক সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ডিপফেক বা উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবনের আগেও ভুয়া কনটেন্ট তৈরির প্রচলন ছিল। অতীতে বডি ডাবল, ফটোশপ কিংবা ভিএফএক্সের ক্লোনিং ও মরফিংয়ের মাধ্যমে এসব কাজ করা হতো। বর্তমানে এআই সেই তালিকায় কেবল একটি নতুন ও দ্রুততর হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হয়েছে। মূল শিল্পকর্মের মূল্য সেই আসল ছবিতেই থাকবে, যা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ”।
অরুণ কুমার জানান, এ ধরনের আপত্তিকর বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলার জন্য প্রচলিত আইনে অনেক পথ খোলা রয়েছে। তবে আসল চ্যালেঞ্জটি হলো এআই কনটেন্ট ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন বৈধ প্ল্যাটফর্মে এআই কনটেন্টের সতর্কবার্তা এমনভাবে ছোট ও আড়ালে দেওয়া থাকে যা দর্শকদের চোখে সহজে পড়ে না। ফলে ইন্টারনেটে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সহজেই প্রকৃত সংবাদ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। তাহলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু দুর্যোগের ভিডিওর মতো এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট আর নিজেদের সংবাদ বলে চালিয়ে দিতে পারবে না।
এই বিশেষজ্ঞের মতে, আমাদের এমন কঠোর আইন প্রয়োজন যেখানে এআই কনটেন্টে বড় ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে দর্শক বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাবেন। তবে এআই প্রযুক্তির সামগ্রিক সমালোচনাকে তিনি বোকামি বলে মনে করেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নিয়ে সব এআইকে খারাপ বলা অথবা এর তৈরি সব কাজকে চুরি বলে দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই।
তিনি আরও বলেন, “এআইয়ের ঢালাও সমালোচনা করা এবং কোনো শিল্পীর অনুমতি ছাড়া তার কাজ ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত এআইয়ের অবৈধ ব্যবহার নিয়ে প্রতিবাদ করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তার ভাষ্যমতে, প্রতিটি সৃজনশীল শিল্পকর্মই অতীতে অন্য কোনো কাজের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে।
তিনি লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও ভ্যান গঘের উদাহরণ টেনে বলেন, কোনো শিল্পী যদি অন্যের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের পুনরুৎপাদন তৈরি করেন, তবে সেটি জালিয়াতি নয়। জালিয়াতি তখনই গণ্য হবে যখন কেউ নিজের তৈরি কাজকে অন্যের কাজ বলে মিথ্যা দাবি করেন। আসল সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দর্শক বুঝতে পারেন না কোনটি সত্য আর কোনটি নকল। ”। বিষয়টি বোঝাতে তিনি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর উদাহরণ দেন।
ডিজিটাল শিল্পীদের পেশাগত ঝুঁকির বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন। অরুণ কুমার স্বীকার করেন যে, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন, গণমাধ্যম ও স্থাপত্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গ্রাফিক শিল্পীদের কাজকে এআইয়ের নিম্নমানের কনটেন্টের সঙ্গে তুলনা করার ফলে প্রকৃত শিল্পীরা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। তবে যারা এআইকে একটি সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন, তাদের জন্যই পেশাগত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
২০২৬ সালকে নিজের কাছে রোমাঞ্চকর, কৌতূহলজাগানিয়া এবং উদ্বেগপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন সিবি অরুণ কুমার। প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এআইকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তার মতে, যারা এই প্রযুক্তির বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলবেন, তাদের সময়ের স্রোতে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে সঠিক আইনি কাঠামোর আওতায় এগিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























