রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাম্মী আহমেদের বাসায় পুলিশি তল্লাশির পর তাঁর স্বামীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটে। এ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রথমে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ১০ লাখ টাকা আদায় করেন। পরবর্তীতে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তারা। আলোচিত এই চাঁদাবাজির ঘটনার তদন্ত শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচয়ধারী ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহম্মেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। তবে সর্বশেষ ১ নভেম্বর পর্যন্ত থানার জিআরে (সাধারণ নিবন্ধ শাখা) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযোগপত্রটি এখনো আদালতে জমা হয়নি। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদ গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কের বাসায় অবস্থান করছেন এমন সংবাদের ভিত্তিতে কথিত কয়েকজন সমন্বয়ক গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। পরে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ ও জানে আলম অপু রাত আনুমানিক দুইটার দিকে গুলশান থানায় গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা করতে বলেন। পুলিশ দল নিয়ে রাত তিনটার দিকে ওই বাসায় তল্লাশি চালায়। তবে শাম্মী আহমেদকে না পেয়ে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে একটি সিজার তালিকা তৈরি করে পুলিশ সদস্যরা স্থান ত্যাগ করেন। মামলাটি ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় করেন সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)। থানা-পুলিশ বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে জানায়। অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে ভেতরে ঢোকেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চলে যাওয়ার পর পরই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু পুনরায় ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। তারা মামলার বাদী ও সাবেক এমপির ৭৫ বছর বয়সী স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখান। বাসা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হলে ভীতিপ্রদর্শনের মুখে বাদী ১০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন। এরপর ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসামিরা পুনরায় দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে চলে যান, যা কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ১০ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে। মামলার ছয় আসামিই এখন জামিনে। গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেখানে বাদীর কাছে টাকা চাওয়া হলে তিনি প্রথমে ৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হন।
পরবর্তীতে গত ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে আসামিরা আবার ওই ভবনের সামনে পৌঁছান। সে সময় বাদী বাসায় না থাকায় নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান তাকে ফোনে বিষয়টি জানান। বাদী সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনকে আটক করে। চাঁদা নিতে গিয়ে ধরা পড়া রাজ্জাকের বাসা থেকে পরবর্তীতে সোয়া ২ কোটি টাকার চেক এবং নগদ ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। ওই কার্যক্রমের মাধ্যমে আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকে।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী জানান, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী পরিচয় দিয়ে থানায় যাতায়াত করতেন।
তারা আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের বাহানায় পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। এই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি ও চাঁদা আদায়ের অপরাধে তদন্তে আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ ও জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অপর আসামি সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সাব্যস্ত হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশের সদস্য এবং আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন, আমিনুল ইসলামসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন ওই।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক পরিচয় দেওয়া আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ চাঁদার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, ১৭ জুলাই তল্লাশির পর জানে আলম অপু বাসাটি থেকে সাবেক এমপির নাম লেখা একটি ইয়ারপড নিয়ে এসেছিলেন। রিয়াদের ভাষ্যমতে, ২৬ জুলাই তিনি বাকি টাকা আনতে সিয়াম, সাদাব ও ইব্রাহিমকে পাঠান এবং পরবর্তীতে পুলিশের কথা বিশ্বাস করে গোলচত্বর থেকে বাসায় এসে ধরা পড়েন। জবানবন্দিতে রাজ্জাক বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে, টাকার লোভ সামলাতে না পেরে অপরাধ করেছি এবং ক্ষমা চাই।’ সেই ইয়ারপডে লেখা ছিল শাম্মি ইয়ারপড। এরপর বাদীকে বলা হয়, তাঁরা বুঝতে পারছেন তাঁর স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে।
অন্যতম আসামি জানে আলম অপুর দেওয়া জবানবন্দিতেও টাকা আদায়ের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে ২৬ জুলাই বাকি টাকা আদায়ের সময় উপস্থিত থাকলেও তিনি পুলিশ দেখে পালিয়ে যান বলে পিবিআই নিশ্চিত করেছে। অপু জানান, রিয়াদ এক কোটি টাকা থেকে দরকষাকষি করে ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন এবং তারা প্রাপ্ত ১০ লাখ টাকা বাড্ডার বাসায় গিয়ে পাঁচ লাখ করে ভাগ করে নেন। অপু তাঁর ভাগের টাকা দিয়ে ৩ লাখ ৭ হাজার টাকায় একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন এবং কিছু দেনা শোধ করেন। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যে মোটরসাইকেল ও আইফোন জব্দ করে পুলিশ। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখ টাকায় বিষয়টি ঠিক হয়।
মামলাটি পরিচালনা নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, ভুয়া পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করা আবদুর রাজ্জাক রিয়াদই এই ঘটনার মূল হোতা। তদন্ত প্রতিবেদনে চাঁদাবাজিতে যুক্ত সকলকেই অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আদালতে বিচারে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আসামিদের একজন শিশু হওয়াই তার বিচার হবে শিশু আদালতে।
এদিকে মামলার বাদী সিদ্দিক আবু জাফরের আইনজীবী জহুরুল আলম তদন্তের ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ধারায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক রিয়াদের বড় ভাই মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, মামলাটি নিয়ে রিয়াদ এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে চান না। আসামিপক্ষের আইনজীবী আকরাম হোসাইন জানান, তাঁরা চার্জশিটের কপি পর্যালোচনার পর আদালতে প্রয়োজনীয় পিটিশন দায়ের করবেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















