সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর সব অভিযোগ সামনে এসেছে। অথচ বিদ্যমান নীতিমালায় স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও, তা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক পরিচয় এবং দলীয় সুপারিশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের জন্য জমা পড়া ৪৭ হাজার আবেদনের মধ্যে বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠেছে যে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে দলীয় কর্মীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এঁদের প্রায় কারও সার ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এক–দুই যুগ ধরে সারের ব্যবসা করছেন এমন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরাও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, সারা দেশের চিত্রই কমবেশি এ রকম। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জেনেশুনে সরকার কেন এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে।
ডিলার নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীদের নিজস্ব বা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বাস্তবে এর তোয়াক্কা না করে নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী ও অনভিজ্ঞদের ডিলারশিপ দেওয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই সার ব্যবসায় নতুন এবং অনভিজ্ঞ। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুরে মনোনীত ৫৭ জন ডিলারের মধ্যে অন্তত ৪৫ জনই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। এ ছাড়া আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। দলীয় লোক ও অনভিজ্ঞরা ডিলারশিপ পাওয়ায় ভবিষ্যতে সার নিয়ে সংকট আরও তীব্র আকার নিতে পারে।
সার একটি স্পর্শকাতর পণ্য হওয়ায় এর সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সরাসরি কৃষিখাত ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তার এই সময়ে সার নিয়ে নতুন কোনো সংকট তৈরি হওয়া কাম্য নয়। আমন মৌসুমে সার না পেয়ে এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে গুদাম ভাঙা বা সড়ক অবরোধের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কৃষকদের। তবুও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেখানে যদি সার নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়, তাহলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে কৃষকদের ভোগান্তি ও উৎপাদনের খরচ—দুই-ই বাড়ে।
এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিটির বৈঠকে অনিয়মের অভিযোগ থাকা অঞ্চলগুলোতে আপাতত ডিলারশিপ স্থগিত রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনেও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের চাপে অযোগ্য বা অনুগতদের নিয়োগ দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় ডিলারদের আংশিক তালিকা প্রকাশ করেছে। খবর জানাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেন।
আমরা মনে করি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি নীতিনির্ধারকদের উচিত কৃষকবান্ধব ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা উপেক্ষিত না হন এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হয়। সার সরবরাহ শৃঙ্খলকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা এখন সময়ের দাবি। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























