বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আমরা যতটা সরব, প্রবীণদের জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা সে তুলনায় অনেক কম। আমরা যাঁর যত্ন নিচ্ছি, তাঁর প্রয়োজনের তালিকা তৈরি করি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে প্রায় প্রতি পাঁচজন নাগরিকের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি।
পরিবার ছোট হওয়া, অভিবাসন ও নগরায়ণের ফলে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার প্রথাগত ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
দেশের মোট বিবাহিত নারীদের প্রায় ৯.৫ শতাংশ বিধবা, যাদের সংখ্যা ৫২ লক্ষেরও বেশি।
স্বামীকে হারানোর পর কিংবা চলাফেরা সীমিত হয়ে এলে তাঁদের পাশে কে থাকবেন, এটি এখন এক বড় সামাজিক প্রশ্ন।
ওষুধ ও খাবারের ব্যবস্থা হলেও তাঁদের মানসিক স্বস্তি ও ছোট ছোট পছন্দের গুরুত্বের জায়গাটি প্রায়ই অবহেলিত থেকে যায়। এবার তাঁর জন্য সেই খাবারের ব্যবস্থা করার পালা আমার।
প্রবীণদের সংকট ও মানসিক স্বাস্থ্য
- মানসিক স্বাস্থ্য: জুয়া ও মাদকে আসক্তিতে শাস্তি, নাকি শিকড়হীন চিকিৎসা
- নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতা: ২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, প্রবীণ পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে একাকিত্ব ও বিষণ্নতা প্রকট।
- সেবা ও সহায়তা: বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন।
নিজের মায়ের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে গিয়ে এই প্রশ্নগুলো আমি নতুনভাবে অনুভব করছি। তাঁর পাশে থাকতে পারায় দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো সরাসরি বুঝতে পারি। কোনো ইচ্ছা হলে তিনি আমাকে বলতে পারেন, আর তাঁর কথায় আমাদের দিনের আয়োজনও বদলে যেতে পারে। বয়স্ক মানুষের জীবনে এই সামান্য সুযোগই অনেক সময় বেঁচে থাকার আনন্দ হয়ে দাঁড়ায়। এক সকালে আম্মা হাড়ের স্যুপ বা পায়া খাওয়ার ইচ্ছা জানালেন। ছোটবেলায় তিনিই আমাদের জন্য এটি রান্না করতেন। এক বাটি পায়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আমি দেশের অন্য হাজারো নিঃসঙ্গ বিধবা মায়েদের কথা ভাবছিলাম, যাদের পাশে হয়তো নিজেদের কথা বলার মতো কেউ নেই। ঝোলের স্বাদ আর হাড়ের গায়ে লেগে থাকা নরম মাংস নিয়ে আমাদের কত আনন্দ ছিল। একসময় এসব সিদ্ধান্তে তাঁরই কর্তৃত্ব ছিল। আম্মা বললেন, এতে ক্যালসিয়াম আছে, হাড় শক্ত হবে। ধীরে, যত্ন করে হাড় থেকে মাংস ছাড়িয়ে নিচ্ছিলেন। কোনো রহস্যময় পারিবারিক রেসিপি ছিল না। হাড়ের সঙ্গে আদা, রসুন, গরমমসলা ও থেঁতলানো জিরা দিয়ে ধীরে রান্না করতে হবে। এত বছর পরে রান্নার কথা শুনতে গিয়ে বুঝলাম, তাঁর স্মৃতিতে আমাদের বেড়ে ওঠার কতখানি জমা আছে। আম্মা এমন অনুভব করেছিলেন কি না, জানি না। তবে কথোপকথনটি আমাকে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবিয়েছে। একা থাকা, নিঃসঙ্গ বোধ করা ও বিষণ্নতায় ভোগা অবশ্য আলাদা বিষয়।
বার্ধক্যের যাপিত জীবন ও সীমাবদ্ধতা
- কেন কফিশপে দেখা যায় না শুধু দুজন বয়স্ক দম্পতিকে
- ব্যক্তি উদ্যোগে বয়স্ক ভাতা
- চলাফেরার সীমাবদ্ধতায় আম্মার বাইরের জগৎ এখন অনেক ছোট; নিয়মিত বাইরে যাওয়া বলতে থেরাপির জন্য হাসপাতালে যাওয়া।
চলাফেরার সীমাবদ্ধতায় আম্মার বাইরের জগৎ এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। বাড়ির দিনগুলোতে বৈচিত্র্য আনার একটি উপায় হলো খাবার। সকালে কোন বাজারে গেলাম, কী পাওয়া গেল, দাম কত—এসব বিষয়ে তিনি এখনো জানতে চান এবং মতামত দেন। সেদিন পায়া রান্নার পর তাঁকে দুই বাটি ঝোল শেষ করতে দেখলাম। খাওয়া শেষে জিজ্ঞেস করলাম তিনি খুশি হয়েছেন কি না। তিনি জানালেন, স্বাদ ভালো হয়েছে কিন্তু রাঁধুনি যদি তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করত, তবে মাংসের পরিমাণ আরেকটু বেশি হতো। রান্নার মান নিয়ে তাঁর এই নিপুণ পর্যবেক্ষণ বলে দেয় যে, বয়স বাড়লেও নিজের পছন্দ ও বিচারবুদ্ধি তাঁদের মধ্যে সজীব থাকে। আমার কাছে নিত্যদিনের বাজারসদাই; তাঁর কাছে ঘরের বাইরের পৃথিবীর খবর। উত্তরটি শুনে মনে হলো, নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে তাঁর ভাবনা কতটা জীবন্ত। কয়েক মাস আগে ধানমন্ডির স্টার কাবাব থেকেও এনে তাঁকে খাইয়েছি। তবে রাঁধুনি তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করলে রান্নাটা আরও ভালো হতে পারত। কত চামচ কোন মসলা, তার নিখুঁত হিসাব দিলেন না।
আমাদের বুঝতে হবে, ওষুধ বা কেবল নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেই প্রবীণদের দিন আনন্দে কাটে না।
শারীরিক নির্ভরশীলতা বাড়লে ছোট কোনো আবদার জানানোর আগেও তাঁরা দ্বিধাবোধ করেন।
সারা জীবন সংসারের জন্য কাজ করার পর বার্ধক্যে এসে কাউকে নিজের গুরুত্ব নতুন করে প্রমাণ করতে হওয়া উচিত নয়।
আমাদের প্রয়োজন তাঁদের কষ্ট শনাক্ত করা এবং পরিবার ও সমাজের অংশ হিসেবে তাঁদের কথা শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। প্রতিটি প্রবীণ মায়ের ছোট ছোট ইচ্ছাগুলো পূরণ করার সামর্থ্য রাখা কেবল দায়িত্ব নয়, এটি তাঁদের প্রতি আমাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার একটি অংশ। সঙ্গ চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে এটি চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে প্রবীণদের মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখনো প্রবীণদের যত্নের বড় অংশ বহন করেন পরিবারের অবৈতনিক পরিচর্যাকারীরা। আমাদের শৈশবের প্রিয় খাবারটি তাঁর কাছে এখন কিছুটা শক্তি ফিরে পাওয়ার আশাও বহন করছে। প্রয়োজন জানাতে বারবার অন্যকে ডাকতে হয়। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ঘরে থাকা প্রবীণ নারীদের প্রয়োজন যেন আড়ালে না পড়ে। পরিবারের বাইরেও নিয়মিত যোগাযোগ ও সহায়তার সুযোগ প্রয়োজন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























