ঢাকা ০৪:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আইজিপি: চাঁদাবাজির অভিযোগে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার ক্ষমতা পাচ্ছে পুলিশ জাপান সফরে তারেক রহমান: অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন গতির আশা রাষ্ট্রদূতকে আনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়: শামা ওবায়েদ সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক চলছে স্মরণকালের সেরা দুর্গাপূজা উপহার দিলেন দেশনায়ক  তারেক রহমান ঢাকার বাস টার্মিনাল ও অটোরিকশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সোহেল গরিবের বিচার, ধনীর বিচার এক করতে হবে —এটাই তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশ আইএইচএফ নেশনস ট্রফিতে ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ বাংলাদেশ কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্বিগুণ যাত্রী সামলাতে হিমশিম দেশের বিমানবন্দরগুলো

বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, দেশে দেশে জেন–জিরা কেন ফুঁসে উঠেছে

ফ্রান্স থেকে ইতালি, স্পেন থেকে সার্বিয়া, পর্তুগাল থেকে গ্রিস—বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপের বড় একটি অংশ। উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। তাঁদের ক্ষোভে ইউরোপের অনেক দেশ এখন অগ্নিগর্ভ। কোথাও অতিরিক্ত খরচে নিম্ন মানের শিক্ষা নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণেরা, কোথাও–বা আবাসনসংকট ও বাড়তি আবাসন ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ এই জেন–জিদের রাজপথে নামিয়ে এনেছে। জেন–জিদের এসব হতাশা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সেই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট হয়েছে, বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তার বড় অংশই এখন জেন–জিরা। এ ঘটনায় দেশটিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট আবাসনসংকট নিয়ে ক্ষোভ উসকে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়া চাকরির বাজার। বাড়িভাড়া বৃদ্ধির ওপর সীমা নির্ধারণ ও ভাড়াটেকে উচ্ছেদ আরও সহজ করে পাস হওয়া নতুন আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিভিন্ন দেশে ক্ষোভের কারণ ও ভিন্ন প্রেক্ষাপট

ফ্রান্সে যে কারণে তুমুল বিক্ষোভ হচ্ছে; স্পেন, গ্রিস, সার্বিয়া কিংবা পর্তুগালে বিক্ষোভের কারণটা আলাদা। স্পেনে বিক্ষোভের শুরু ছোট্ট একটি ঘটনা নিয়ে, যেখানে ৮৭ বছরের মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও তরুণেরা। অন্যদিকে ফ্রান্সে বিক্ষোভের শুরুটা শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের চরম দুরবস্থা, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমেছে। আন্দোলনকারী তরুণেরা সমর্থন জানান শিক্ষকদের আন্দোলনেও। কেউ কেউ শিক্ষা খাতে বাড়তি সরকারি বরাদ্দের দাবিতে সোচ্চার, আবার কেউবা জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ নিয়ে চরম হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। চাই, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আর সামাজিক ন্যায়বিচার। ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার প্রায় ১০০০। জায়গাটি রোম থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার বা ৭৫ মাইল দূরে ছিল। ইতালি সরকার বারবার বলার চেষ্টা করছে, ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে ইতালিতে সংঘটিত বিক্ষোভের মিল নেই। পরে চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার।

বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা, লুটপাট ও গণগ্রেপ্তারে পুরো ফ্রান্স উত্তাল হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের প্রধান সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ​​ব্রিতো সিএনএনকে বলেন, ফ্রান্সে এটি নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়। ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও জড়িত।

গত ৯ বছর ধরে প্রতিবার সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে দেশটিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়ে আসছে। তবে এবার শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটানো, শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো ও জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভের ব্যাপকতা বহুগুণ বেড়েছে। অ্যালিস দ্য 브্রিতো আরও বলেন, ‘আমি তফাতের চেয়ে বরং মিল বেশি দেখছি। আমরা সবাই শিক্ষা খাতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে যোগ করেন, জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সবাই এখন ক্লান্ত। এতে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সার্বিয়ায় নির্বাচনে কি দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিস তরুণদের বিক্ষোভে হারতে বসেছেন।

শিক্ষা ও আবাসন সংকট: ইউরোপজুড়ে তরুণের একতা

এক দেশের জেন–জি বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদের রাজপথে নামতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ইতালি ও গ্রিসের তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাজপথের স্লোগানে ফরাসী বিক্ষোভকারীদের কথা বলেছেন এবং সংহতি জানিয়েছেন। বিক্ষোভের উত্তাল এ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা আর পরামর্শ পরস্পর ভাগ করে নিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্য, এথেন্সসহ গ্রিসের বিভিন্ন জায়গায় হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হন।

অনেকটা একই সুরে কথা বলেন ইতালির ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলা। গত সপ্তাহান্তে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বিদ্যালয় চাই, যেগুলোর ছাদ ধসে আমাদের মাথায় পড়বে না। আসুন, আমরা আমাদের দাবির পক্ষে সোচ্চার হই।’ ইতালির রাজধানী রোমে ৭ অক্টোবর একটি হাইস্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করে, সাশ্রয়ী আবাসনের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রোমের বাসিন্দা এলিসা পাস্তোরে জানান, তিনি ও তাঁর ভাই একই কক্ষে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এবং সেই কক্ষের ভাড়া দিতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভাই রোমে আসার আগে খরচ বাঁচাতে তিনি রাজধানীর বাইরের একটি দূরবর্তী এলাকায় বসবাস করতেন। সেখান থেকে নিয়মিত ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ব্যস্ততম রোসিও চত্বরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জড়ো হচ্ছেন হাজারো মানুষ। তাঁদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। তাঁদের হাতে থাকা পতাকায় লেখা দেখা গেছে ‘কাসাস পারা মোরার’, যার অর্থ ‘বসবাসের জন্য বাড়ি চাই’। গত মঙ্গলবার ভোরে সেখান থেকে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও মৌলিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডент’–এর দৈনিক নিউজ লেটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমান বিক্ষোভের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ‘বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এত দিনের জমে থাকা হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৌলিকভাবে উদার গণতন্ত্রের যে প্রতিশ্রুতি ছিল—পরবর্তী প্রজন্ম তাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবনযাপন করবে—সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়ছে। ইইউর যেসব দেশে বিক্ষোভের উত্তাপ বেশি, তার মধ্যে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগাল অন্যতম। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর কথা বলা যায়, যা সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় তরুণদের মনে আশঙ্কা, তাঁদের মা–বাবার প্রজন্ম যেসব সুযোগ–সুবিধা পেয়েছে, তাঁরা আর সেসব পাবেন না। ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না—এমন অনুভূতি বিক্ষোভগুলোয় প্রতিফলিত হচ্ছে।’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে, বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। ফ্রান্সের বিক্ষোভের পেছনে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জটিলতার ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ফরাসি কট্টর ডানপন্থীরা। পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন, বিক্ষোভকারীরা দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য করার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে চাইছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে ছাত্র আন্দোলন

আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। সেখানে এক বিক্ষোভকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা পরিবর্তন চাই। আমরা বিপ্লব চাই।’ তবে শিক্ষার্থীদের এই তীব্র বিক্ষোভ ও পদত্যাগের দাবি স্রেফ প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে সার্বিয়াতেও দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার সংকটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জেন-জিদের জোরদার বিক্ষোভ চলছে।

অন্যান্য পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ডাক

শুধু তরুণ ও শিক্ষার্থীরা নন, ইতালির ট্রাকচালকেরাও বিক্ষোভে নেমেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সরবরাহ কমায় জ্বালানি পণ্যের দাম হু হু করে বেড়েছে, যার ফলে তাঁদের কাজ ও আয় কমেছে এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্সে ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। বর্তমান সংকট নিরসনে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে

  • ফ্রান্স ও স্পেনের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
  • জার্মানিতে ‘জেন–জেড রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানিজুড়ে মহাসমাবেশ ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
  • শিক্ষার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর এক দিনের সম্মিলিত কর্মসূচি পালনের যৌথ পরিকল্পনা করছে ইতালি ও যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।
আপলোডকারীর তথ্য

দেশে হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, দেশে দেশে জেন–জিরা কেন ফুঁসে উঠেছে

আপডেট সময় ০৩:৫৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্স থেকে ইতালি, স্পেন থেকে সার্বিয়া, পর্তুগাল থেকে গ্রিস—বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপের বড় একটি অংশ। উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। তাঁদের ক্ষোভে ইউরোপের অনেক দেশ এখন অগ্নিগর্ভ। কোথাও অতিরিক্ত খরচে নিম্ন মানের শিক্ষা নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণেরা, কোথাও–বা আবাসনসংকট ও বাড়তি আবাসন ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ এই জেন–জিদের রাজপথে নামিয়ে এনেছে। জেন–জিদের এসব হতাশা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সেই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট হয়েছে, বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তার বড় অংশই এখন জেন–জিরা। এ ঘটনায় দেশটিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট আবাসনসংকট নিয়ে ক্ষোভ উসকে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়া চাকরির বাজার। বাড়িভাড়া বৃদ্ধির ওপর সীমা নির্ধারণ ও ভাড়াটেকে উচ্ছেদ আরও সহজ করে পাস হওয়া নতুন আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিভিন্ন দেশে ক্ষোভের কারণ ও ভিন্ন প্রেক্ষাপট

ফ্রান্সে যে কারণে তুমুল বিক্ষোভ হচ্ছে; স্পেন, গ্রিস, সার্বিয়া কিংবা পর্তুগালে বিক্ষোভের কারণটা আলাদা। স্পেনে বিক্ষোভের শুরু ছোট্ট একটি ঘটনা নিয়ে, যেখানে ৮৭ বছরের মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও তরুণেরা। অন্যদিকে ফ্রান্সে বিক্ষোভের শুরুটা শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের চরম দুরবস্থা, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমেছে। আন্দোলনকারী তরুণেরা সমর্থন জানান শিক্ষকদের আন্দোলনেও। কেউ কেউ শিক্ষা খাতে বাড়তি সরকারি বরাদ্দের দাবিতে সোচ্চার, আবার কেউবা জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ নিয়ে চরম হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। চাই, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আর সামাজিক ন্যায়বিচার। ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার প্রায় ১০০০। জায়গাটি রোম থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার বা ৭৫ মাইল দূরে ছিল। ইতালি সরকার বারবার বলার চেষ্টা করছে, ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে ইতালিতে সংঘটিত বিক্ষোভের মিল নেই। পরে চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার।

বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা, লুটপাট ও গণগ্রেপ্তারে পুরো ফ্রান্স উত্তাল হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের প্রধান সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ​​ব্রিতো সিএনএনকে বলেন, ফ্রান্সে এটি নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়। ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও জড়িত।

গত ৯ বছর ধরে প্রতিবার সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে দেশটিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়ে আসছে। তবে এবার শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটানো, শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো ও জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভের ব্যাপকতা বহুগুণ বেড়েছে। অ্যালিস দ্য 브্রিতো আরও বলেন, ‘আমি তফাতের চেয়ে বরং মিল বেশি দেখছি। আমরা সবাই শিক্ষা খাতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে যোগ করেন, জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সবাই এখন ক্লান্ত। এতে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সার্বিয়ায় নির্বাচনে কি দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিস তরুণদের বিক্ষোভে হারতে বসেছেন।

শিক্ষা ও আবাসন সংকট: ইউরোপজুড়ে তরুণের একতা

এক দেশের জেন–জি বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদের রাজপথে নামতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ইতালি ও গ্রিসের তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাজপথের স্লোগানে ফরাসী বিক্ষোভকারীদের কথা বলেছেন এবং সংহতি জানিয়েছেন। বিক্ষোভের উত্তাল এ সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা আর পরামর্শ পরস্পর ভাগ করে নিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্য, এথেন্সসহ গ্রিসের বিভিন্ন জায়গায় হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হন।

অনেকটা একই সুরে কথা বলেন ইতালির ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলা। গত সপ্তাহান্তে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন বিদ্যালয় চাই, যেগুলোর ছাদ ধসে আমাদের মাথায় পড়বে না। আসুন, আমরা আমাদের দাবির পক্ষে সোচ্চার হই।’ ইতালির রাজধানী রোমে ৭ অক্টোবর একটি হাইস্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করে, সাশ্রয়ী আবাসনের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রোমের বাসিন্দা এলিসা পাস্তোরে জানান, তিনি ও তাঁর ভাই একই কক্ষে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন এবং সেই কক্ষের ভাড়া দিতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভাই রোমে আসার আগে খরচ বাঁচাতে তিনি রাজধানীর বাইরের একটি দূরবর্তী এলাকায় বসবাস করতেন। সেখান থেকে নিয়মিত ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ব্যস্ততম রোসিও চত্বরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জড়ো হচ্ছেন হাজারো মানুষ। তাঁদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। তাঁদের হাতে থাকা পতাকায় লেখা দেখা গেছে ‘কাসাস পারা মোরার’, যার অর্থ ‘বসবাসের জন্য বাড়ি চাই’। গত মঙ্গলবার ভোরে সেখান থেকে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও মৌলিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডент’–এর দৈনিক নিউজ লেটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমান বিক্ষোভের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ‘বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এত দিনের জমে থাকা হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৌলিকভাবে উদার গণতন্ত্রের যে প্রতিশ্রুতি ছিল—পরবর্তী প্রজন্ম তাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবনযাপন করবে—সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়ছে। ইইউর যেসব দেশে বিক্ষোভের উত্তাপ বেশি, তার মধ্যে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগাল অন্যতম। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর কথা বলা যায়, যা সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় তরুণদের মনে আশঙ্কা, তাঁদের মা–বাবার প্রজন্ম যেসব সুযোগ–সুবিধা পেয়েছে, তাঁরা আর সেসব পাবেন না। ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না—এমন অনুভূতি বিক্ষোভগুলোয় প্রতিফলিত হচ্ছে।’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে, বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। ফ্রান্সের বিক্ষোভের পেছনে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জটিলতার ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ফরাসি কট্টর ডানপন্থীরা। পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন, বিক্ষোভকারীরা দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য করার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে চাইছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে ছাত্র আন্দোলন

আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। সেখানে এক বিক্ষোভকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা পরিবর্তন চাই। আমরা বিপ্লব চাই।’ তবে শিক্ষার্থীদের এই তীব্র বিক্ষোভ ও পদত্যাগের দাবি স্রেফ প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে সার্বিয়াতেও দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার সংকটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জেন-জিদের জোরদার বিক্ষোভ চলছে।

অন্যান্য পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ডাক

শুধু তরুণ ও শিক্ষার্থীরা নন, ইতালির ট্রাকচালকেরাও বিক্ষোভে নেমেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সরবরাহ কমায় জ্বালানি পণ্যের দাম হু হু করে বেড়েছে, যার ফলে তাঁদের কাজ ও আয় কমেছে এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্সে ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। বর্তমান সংকট নিরসনে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে

  • ফ্রান্স ও স্পেনের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
  • জার্মানিতে ‘জেন–জেড রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানিজুড়ে মহাসমাবেশ ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
  • শিক্ষার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর এক দিনের সম্মিলিত কর্মসূচি পালনের যৌথ পরিকল্পনা করছে ইতালি ও যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।