ফ্রান্সে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন বড় শহরে শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশাপাশি সরকারি ভবন, পৌর কার্যালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো অস্থিতিশীল ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, ফরাসি প্রজাতন্ত্রে সহিংসতার কোনো স্থান নেই। ফেসবুকে নিজের বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যারা সরকারি প্রাঙ্গণ, পৌরসভা ভবন এবং দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে, তাদের সবাইকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর পাশে জাতি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার স্বার্থে সবাইকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কয়েকটি এলাকায় গাড়ি ও আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া এবং দোকানপাটে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে অবশ্য সহিংসতার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ মিছিলের কথাও উঠে এসেছে। প্যারিসে অনুমোদিত পথে চলা একটি মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
বিক্ষোভের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও ফরাসি দৈনিক লে মঁদের তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে নানা বস্তু নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়। সহিংসতার জের ধরে মার্সেইয়ের পৌরসভা ভবনে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া লিলে শহরে মেয়রের কার্যালয়ের ভেতরের কক্ষগুলোতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লিয়োঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘাতের পাশাপাশি অনেক স্থানে শান্তিপূর্ণ মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সহিংসতায় জড়িত গোষ্ঠী আর সাধারণ প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ্য এক নয়।
গ্রেপ্তার ও অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা নিয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তবে সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জনসমাগম নিয়ে সরকারি ও আয়োজক সংগঠনের দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্যারিসের বাইরে ১৪০টি কর্মসূচিতে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ জন অংশ নিয়েছেন। বিপরীতে, শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দেশজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলে দাবি করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্ব স্ব পক্ষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে নির্দেশ করে। তাই চূড়ান্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা জানতে সর্বশেষ সরকারি তথ্য প্রয়োজন। দুটি হিসাবই সংশ্লিষ্ট পক্ষের দেওয়া, তাই এগুলোকে একই ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বর্তমান এই আন্দোলনের মূলে রয়েছে জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরকারি সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। ২০১৮-১৯ সালের আলোচিত ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের আদলে এবার শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে, যারা মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধার অভাব ও সংকট নিয়ে সরব। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত অংশগ্রহণে এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ রাজপথে নামলেও এখন তা বড় ধরনের সামাজিক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান কর্মসূচির কিছু মিল থাকলেও এবারের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়েও কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আহ্বানের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের প্রশাসন এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে যেমন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে অসন্তোষ নিরসন করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে জনগণের দাবিগুলোর কার্যকর সমাধান না হলে এবং সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলে ফ্রান্সে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রক্ষা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ফরাসি সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























