ঢাকা ১২:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রথমবারের মতো উদ্ভিদের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া চোখে দেখল মানুষ

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে উদ্ভিদ- এ কথা বিজ্ঞানীরা বহু শতাব্দী ধরেই জানেন। পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোকে স্টোমাটা বলা হয়, যা আলোকসংস্লেষণের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ এবং একই সঙ্গে জলীয় বাষ্পের ক্ষয়— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে এবার বিজ্ঞানীরা সেই ‘মাজিক’প্রক্রিয়া চর্মচক্ষে দেখাতে পারছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষকরা একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্ভিদের এই শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ‘স্টোমাটা ইন-সাইট’ নামের এই যন্ত্রটি পাতার ওপর থাকা অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র বা স্টোমাটার কার্যপ্রণালি উন্মোচন করেছে, যেগুলোকে অনেক সময় উদ্ভিদের ‘মুখ’ও বলা হয়।

এই স্টোমাটার মাধ্যমেই কার্বন ডাই-অক্সাইড, অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্পের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদ। আলোকসংস্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস গ্রহণ এবং ট্রান্সপিরেশনের মাধ্যমে পানির ক্ষয়— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে স্টোমাটা খোলে ও বন্ধ হয়।

এই যুগান্তকারী প্রযুক্তিতে উচ্চ রেজুল্যুশনের কনফোকাল মাইক্রোস্কোপ, অত্যন্ত নির্ভুল গ্যাস-আদান-প্রদান পরিমাপক ব্যবস্থা এবং ছবি বিশ্লেষণের জন্য উন্নত মেশিন-লার্নিং সফটওয়্যারের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। পরীক্ষার সময় পাতার ছোট অংশকে হাতের তালু-আকারের একটি কমপ্যাক্ট চেম্বারের ভেতরে রাখা হয়, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা এবং পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গবেষক দলের ধারণ করা ভিডিওতে উদ্ভিদের কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ এবং অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প নির্গত করার সময় গ্যাসের গতিশীল চলাচল স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। আলোকসংস্লেষণ ও উদ্ভিদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি ও সেন্সরের সাহায্যে আলো, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনে স্টোমাটার প্রতিক্রিয়ার সময় কোষীয় স্তরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোও তুলে আনতে পেরেছেন গবেষকরা। এর ফলে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা, পানি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য সম্পর্কে নতুন ধারণা মিলেছে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের প্ল্যান্ট বায়োলজি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট ফর জেনোমিক বায়োলজির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু লিকি ফক্স নিউজকে বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলো থাকলে স্টোমাটা খোলে এবং অন্ধকারে বন্ধ হয়ে যায়। অনুকূল পরিবেশে যাতে আলোকসংস্লেষণ সম্ভব হয়, আবার একই সঙ্গে পাতার ভেতর থেকে বায়ুমণ্ডলে পানির অপচয় কমানো যায়— এই লক্ষ্যেই এমনটি ঘটে।’

উদ্ভিদের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে এই নতুন গবেষণা ফসলের জাত উন্নয়ন কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন গবেষণার ফলে স্টোমাটার খোলা ও বন্ধ হওয়া নিয়ন্ত্রণকারী ভৌত ও রাসায়নিক সংকেত, পাশাপাশি স্টোমাটার ঘনত্বের প্রভাব সম্পর্কে বিশদ ধারণা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে তারা এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারবেন, যা পানির আরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।

কারণ কৃষি উৎপাদনে পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে পানির স্বল্পতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে সক্ষম ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও খরার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ফসলের সহনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন এই প্রযুক্তির পেটেন্ট নিয়েছে। যদিও এটি এখনও বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়া হয়নি। তবে গবেষকরা আশা করছেন, শিগগিরই এটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের জন্য উৎপাদন করা হবে। বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্ল্যান্ট ফিজিওলজি জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রথমবারের মতো উদ্ভিদের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া চোখে দেখল মানুষ

আপডেট সময় ১০:২০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে উদ্ভিদ- এ কথা বিজ্ঞানীরা বহু শতাব্দী ধরেই জানেন। পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোকে স্টোমাটা বলা হয়, যা আলোকসংস্লেষণের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ এবং একই সঙ্গে জলীয় বাষ্পের ক্ষয়— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে এবার বিজ্ঞানীরা সেই ‘মাজিক’প্রক্রিয়া চর্মচক্ষে দেখাতে পারছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষকরা একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্ভিদের এই শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ‘স্টোমাটা ইন-সাইট’ নামের এই যন্ত্রটি পাতার ওপর থাকা অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র বা স্টোমাটার কার্যপ্রণালি উন্মোচন করেছে, যেগুলোকে অনেক সময় উদ্ভিদের ‘মুখ’ও বলা হয়।

এই স্টোমাটার মাধ্যমেই কার্বন ডাই-অক্সাইড, অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্পের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদ। আলোকসংস্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস গ্রহণ এবং ট্রান্সপিরেশনের মাধ্যমে পানির ক্ষয়— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে স্টোমাটা খোলে ও বন্ধ হয়।

এই যুগান্তকারী প্রযুক্তিতে উচ্চ রেজুল্যুশনের কনফোকাল মাইক্রোস্কোপ, অত্যন্ত নির্ভুল গ্যাস-আদান-প্রদান পরিমাপক ব্যবস্থা এবং ছবি বিশ্লেষণের জন্য উন্নত মেশিন-লার্নিং সফটওয়্যারের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। পরীক্ষার সময় পাতার ছোট অংশকে হাতের তালু-আকারের একটি কমপ্যাক্ট চেম্বারের ভেতরে রাখা হয়, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা এবং পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গবেষক দলের ধারণ করা ভিডিওতে উদ্ভিদের কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ এবং অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প নির্গত করার সময় গ্যাসের গতিশীল চলাচল স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। আলোকসংস্লেষণ ও উদ্ভিদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি ও সেন্সরের সাহায্যে আলো, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনে স্টোমাটার প্রতিক্রিয়ার সময় কোষীয় স্তরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোও তুলে আনতে পেরেছেন গবেষকরা। এর ফলে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা, পানি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য সম্পর্কে নতুন ধারণা মিলেছে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের প্ল্যান্ট বায়োলজি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট ফর জেনোমিক বায়োলজির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু লিকি ফক্স নিউজকে বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলো থাকলে স্টোমাটা খোলে এবং অন্ধকারে বন্ধ হয়ে যায়। অনুকূল পরিবেশে যাতে আলোকসংস্লেষণ সম্ভব হয়, আবার একই সঙ্গে পাতার ভেতর থেকে বায়ুমণ্ডলে পানির অপচয় কমানো যায়— এই লক্ষ্যেই এমনটি ঘটে।’

উদ্ভিদের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে এই নতুন গবেষণা ফসলের জাত উন্নয়ন কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন গবেষণার ফলে স্টোমাটার খোলা ও বন্ধ হওয়া নিয়ন্ত্রণকারী ভৌত ও রাসায়নিক সংকেত, পাশাপাশি স্টোমাটার ঘনত্বের প্রভাব সম্পর্কে বিশদ ধারণা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে তারা এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারবেন, যা পানির আরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।

কারণ কৃষি উৎপাদনে পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে পানির স্বল্পতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে সক্ষম ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও খরার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ফসলের সহনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন এই প্রযুক্তির পেটেন্ট নিয়েছে। যদিও এটি এখনও বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়া হয়নি। তবে গবেষকরা আশা করছেন, শিগগিরই এটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের জন্য উৎপাদন করা হবে। বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্ল্যান্ট ফিজিওলজি জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।