ঢাকা ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পাল্টা জবাব দিলেন কিউবার প্রেসিডেন্ট বনশ্রীতে স্কুলছাত্রী খুন,পুলিশের সন্দেহের তালিকায় পলাতক রেস্তোরাঁ কর্মী স্বৈরাচারের লোকেরা নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টা করবে: ড. মুহাম্মদ ইউনূস গাজীপুরে নবজাতকের লাশ নিয়ে কুকুরের টানাহ্যাঁচড়া, উদ্ধার করল পুলিশ ধর্মকে পুঁজি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে : খায়রুল কবির খোকন দলে বড় নাম থাকলেও জেতার জন্য সবাইকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে: সোহান ২৫ জন বাংলাদেশিকে ক্ষমা করল আমিরাত দেশের ভবিষ্যত গড়ার জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় নিশ্চিত করতে হবে : চরমোনাই পীর ব্যালটবাক্স ভরে কোনো নির্দিষ্ট প্রতীকের জয়ের সুযোগ নেই: রুমিন ফারহানা এইচএসসি পাসে নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ , রোগী দেখেন দুই জেলায়

কাজ, স্বাধীনতা ও সীমারেখা, ইসলামের আলোকে নারীর কর্মজীবন

আকাশ জাতীয় ডেস্ক : 

নারীর চাকরি—এই একটি শব্দযুগল আজ মুসলিম সমাজে যতটা আলোচনার জন্ম দেয়, ততটা ভুল বোঝাবুঝিরও জন্ম দেয়। কেউ এটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করান, কেউ আবার ধর্মকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে ‘স্বাধীনতা’র একক ব্যাখ্যা দাঁড় করান।

অথচ ইসলাম কোনো চরম অবস্থান নেয় না, ইসলাম বরাবরই ভারসাম্যের ধর্ম—যেখানে অধিকার আছে, আবার সীমারেখাও আছে।

কুরআন প্রথমেই একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে দেয়, মানুষের মর্যাদা লিঙ্গনির্ভর নয়, আমলনির্ভর।

মহান রব্বুল আলামীন বলেন, ‘পুরুষ হোক বা নারী—যে ঈমানের সঙ্গে সৎকর্ম করে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সূরা নাহল ৯৭)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, কর্ম ও প্রচেষ্টায় নারী কোনোভাবেই ইসলামে দ্বিতীয় শ্রেণির নয়।

ইসলামের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নতুন কোনো বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ সা. এর স্ত্রী খাদিজা রা. ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, যার সম্পদ ও ব্যবস্থাপনায় বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত।

উম্মে সালামা রা., আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর মতো সাহাবিয়াতরা সামাজিক দায়িত্ব, চিকিৎসা, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন। এসব ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রমাণ করে, ইসলাম নারীর কাজকে নিষিদ্ধ করেনি—বরং নীতিনির্ভর করেছে।

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ফিকহে নারীর উপার্জনের অধিকার সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। ইমাম মালিক রহ. ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মতেও নারী প্রয়োজনে ও শর্তসাপেক্ষে ঘরের বাইরে কাজ করতে পারে।

ইমাম ইবনু কাসির ও ইমাম কুরতুবি কুরআনের ব্যাখ্যায় বলেন, নারীর কাজ হারাম নয়, হারাম হলো সেই পরিবেশ ও পদ্ধতি, যা তাকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়।

এখানেই আসে ইসলামের শর্তের প্রশ্ন। ইসলাম বলে না, নারী ঘরের বাইরে যাবে না, ইসলাম বলে, নারী যেন তার ঈমান, পর্দা ও নৈতিকতা হারিয়ে না ফেলে। কাজ এমন হবে না যেখানে অবাধ মেলামেশা, শালীনতার লঙ্ঘন, শরীর প্রদর্শন, মদ–জুয়া–অশ্লীলতা বা হারাম শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকে।

তাই ফিকহবিদরা একমত যে নৃত্য, মডেলিং, অশ্লীল বিনোদন, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, মদ বা জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চাকরি—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিষিদ্ধ।

অন্যদিকে শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, হালাল ব্যবসা, নারী ও শিশু সংশ্লিষ্ট সেবা, এমনকি প্রয়োজন হলে শিল্পকারখানায় কাজ—এসব ক্ষেত্র ইসলামে নীতিগতভাবে অনুমোদিত, যদি পর্দা, নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্ব রক্ষা করা যায়।

সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দায়িত্ববিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক জরিপ দেখায়, কর্মজীবী নারীদের বড় একটি অংশ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি নারীর ক্ষমতায়ন নয়, বরং নতুন এক ধরনের শোষণের দরজা খুলে দেয়। ইসলাম এখানেই প্রশ্ন তোলে—কাজ কি নারীর সম্মান বাড়াচ্ছে, না তাকে ভোগ্য পণ্যে পরিণত করছে?

ইসলাম নারীর মূল দায়িত্ব হিসেবে পরিবারকে গুরুত্ব দেয়—কিন্তু পরিবারকে কারাগার বানায় না। একইভাবে কাজের অনুমতি দেয়—কিন্তু কাজকে আত্মবিস্মরণের লাইসেন্স দেয় না। এই ভারসাম্যটাই ইসলামের সৌন্দর্য।

আধুনিকতার নামে যদি নারী তার পর্দা, আত্মমর্যাদা ও মাতৃত্বের সম্মান হারায়, তবে সেটি উন্নয়ন নয়, আর ধর্মের নামে যদি নারীর শিক্ষা ও যোগ্যতাকে দমিয়ে রাখা হয়, সেটিও ইসলাম নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী সেই, যে প্রয়োজনে কাজ করে—কিন্তু কাজ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, যে সমাজে ভূমিকা রাখে—কিন্তু নিজের ঈমান বিসর্জন দেয় না। এই ভারসাম্যই মুসলিম সমাজকে সুস্থ রাখে।

আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। নারীর চাকরি প্রশ্নে না অন্ধ নিষেধাজ্ঞা, না সীমাহীন ছাড়—বরং কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেকের আলোকে একটি ন্যায়সঙ্গত পথ। ইসলাম সেই পথই দেখায়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পাল্টা জবাব দিলেন কিউবার প্রেসিডেন্ট

কাজ, স্বাধীনতা ও সীমারেখা, ইসলামের আলোকে নারীর কর্মজীবন

আপডেট সময় ০৮:৩১:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক : 

নারীর চাকরি—এই একটি শব্দযুগল আজ মুসলিম সমাজে যতটা আলোচনার জন্ম দেয়, ততটা ভুল বোঝাবুঝিরও জন্ম দেয়। কেউ এটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করান, কেউ আবার ধর্মকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে ‘স্বাধীনতা’র একক ব্যাখ্যা দাঁড় করান।

অথচ ইসলাম কোনো চরম অবস্থান নেয় না, ইসলাম বরাবরই ভারসাম্যের ধর্ম—যেখানে অধিকার আছে, আবার সীমারেখাও আছে।

কুরআন প্রথমেই একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে দেয়, মানুষের মর্যাদা লিঙ্গনির্ভর নয়, আমলনির্ভর।

মহান রব্বুল আলামীন বলেন, ‘পুরুষ হোক বা নারী—যে ঈমানের সঙ্গে সৎকর্ম করে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সূরা নাহল ৯৭)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, কর্ম ও প্রচেষ্টায় নারী কোনোভাবেই ইসলামে দ্বিতীয় শ্রেণির নয়।

ইসলামের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ নতুন কোনো বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ সা. এর স্ত্রী খাদিজা রা. ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, যার সম্পদ ও ব্যবস্থাপনায় বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত।

উম্মে সালামা রা., আসমা বিনতে আবু বকর রা. এর মতো সাহাবিয়াতরা সামাজিক দায়িত্ব, চিকিৎসা, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন। এসব ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রমাণ করে, ইসলাম নারীর কাজকে নিষিদ্ধ করেনি—বরং নীতিনির্ভর করেছে।

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ফিকহে নারীর উপার্জনের অধিকার সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। ইমাম মালিক রহ. ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মতেও নারী প্রয়োজনে ও শর্তসাপেক্ষে ঘরের বাইরে কাজ করতে পারে।

ইমাম ইবনু কাসির ও ইমাম কুরতুবি কুরআনের ব্যাখ্যায় বলেন, নারীর কাজ হারাম নয়, হারাম হলো সেই পরিবেশ ও পদ্ধতি, যা তাকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়।

এখানেই আসে ইসলামের শর্তের প্রশ্ন। ইসলাম বলে না, নারী ঘরের বাইরে যাবে না, ইসলাম বলে, নারী যেন তার ঈমান, পর্দা ও নৈতিকতা হারিয়ে না ফেলে। কাজ এমন হবে না যেখানে অবাধ মেলামেশা, শালীনতার লঙ্ঘন, শরীর প্রদর্শন, মদ–জুয়া–অশ্লীলতা বা হারাম শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকে।

তাই ফিকহবিদরা একমত যে নৃত্য, মডেলিং, অশ্লীল বিনোদন, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, মদ বা জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চাকরি—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিষিদ্ধ।

অন্যদিকে শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, হালাল ব্যবসা, নারী ও শিশু সংশ্লিষ্ট সেবা, এমনকি প্রয়োজন হলে শিল্পকারখানায় কাজ—এসব ক্ষেত্র ইসলামে নীতিগতভাবে অনুমোদিত, যদি পর্দা, নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্ব রক্ষা করা যায়।

সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দায়িত্ববিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক জরিপ দেখায়, কর্মজীবী নারীদের বড় একটি অংশ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি নারীর ক্ষমতায়ন নয়, বরং নতুন এক ধরনের শোষণের দরজা খুলে দেয়। ইসলাম এখানেই প্রশ্ন তোলে—কাজ কি নারীর সম্মান বাড়াচ্ছে, না তাকে ভোগ্য পণ্যে পরিণত করছে?

ইসলাম নারীর মূল দায়িত্ব হিসেবে পরিবারকে গুরুত্ব দেয়—কিন্তু পরিবারকে কারাগার বানায় না। একইভাবে কাজের অনুমতি দেয়—কিন্তু কাজকে আত্মবিস্মরণের লাইসেন্স দেয় না। এই ভারসাম্যটাই ইসলামের সৌন্দর্য।

আধুনিকতার নামে যদি নারী তার পর্দা, আত্মমর্যাদা ও মাতৃত্বের সম্মান হারায়, তবে সেটি উন্নয়ন নয়, আর ধর্মের নামে যদি নারীর শিক্ষা ও যোগ্যতাকে দমিয়ে রাখা হয়, সেটিও ইসলাম নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী সেই, যে প্রয়োজনে কাজ করে—কিন্তু কাজ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, যে সমাজে ভূমিকা রাখে—কিন্তু নিজের ঈমান বিসর্জন দেয় না। এই ভারসাম্যই মুসলিম সমাজকে সুস্থ রাখে।

আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। নারীর চাকরি প্রশ্নে না অন্ধ নিষেধাজ্ঞা, না সীমাহীন ছাড়—বরং কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেকের আলোকে একটি ন্যায়সঙ্গত পথ। ইসলাম সেই পথই দেখায়।