ঢাকা ১২:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুছাব্বির হত্যার ঘটনায় প্রধান শ্যুটারসহ গ্রেফতার ৩ নির্বাচন বানচালে সীমান্তের ওপারে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে: আদিলুর রহমান উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ৪ অধ্যাদেশ অনুমোদন ভারতের দালাল পাকিস্তানের দালাল, এসব বলা বাদ দিতে হবে: (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান জামায়াত ধর্মকে ব্যবহার করছে : টুকু ঋণের বিনিময়ে যুদ্ধবিমান লেনদেনে আলোচনায় সৌদি-পাকিস্তান ‘দুষ্কৃতকারীরা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত’: মির্জা ফখরুল আজকের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হবে আগামী ১০ বছর: তামিম ইকবাল নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে : ইইউ পর্যবেক্ষণ প্রধান ভারতীয়দের দুঃসংবাদ দিল বাংলাদেশ

সন্তান প্রতিপালনে মায়ের দোয়া ও আদর্শের শক্তি

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুদীর্ঘ যাত্রাটি শুরু হয় একজন মায়ের কোল থেকে; কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা অফিসের ডেস্ক থেকে নয়। কাজেই মায়ের সেই কোলই ব্যক্তির প্রথম পাঠশালা, প্রথম মাদরাসা, প্রথম চরিত্র গঠনের কারখানা। পৃথিবীর ইতিহাসে যত মানুষ সাফল্য পেয়েছে, যত মানুষ আলোকিত চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদের পেছনে যদি আলো ফেলে দেখা যায়, দেখা যাবে একজন নীরব সাধিকার অবিরাম দোয়া, ত্যাগ ও আদর্শের ছোঁয়া রয়েছে। তিনই হলেন মা।

আজকের সমাজে সন্তান প্রতিপালনকে শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল আর কোচিংয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ করে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম সন্তান গঠনের ক্ষেত্রে যে মৌলিক শক্তির কথা বলে; তা কোনো বস্তুগত উপকরণ নয়, বরং সে মায়ের দোয়া ও আদর্শিক উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক। এই দুই শক্তিই এমন এক অদৃশ্য ভিত্তি তৈরি করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি মানুষ সারা জীবন টিকে থাকে।

ইসলামে দোয়ার মর্যাদা ব্যাপক বিস্তৃত। এর রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। কিন্তু কিছু দোয়া এমন রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয় : (১) মজলুমের দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া, (৩) সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৬)

এ হাদিসে ‘মা-বাবা’ বলা হলেও ইসলামী স্কলারদের সর্বসম্মত মত হলো, মায়ের দোয়ার প্রভাব আরো গভীর। কারণ সন্তান জন্ম, লালন ও মানসিক গঠনে মায়ের ভূমিকা অধিক প্রত্যক্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সন্তানের অন্তর যে পথে বাঁক নেয়, তা মূলত নির্ভর করে তার ঘরে উচ্চারিত দোয়া ও কথার ওপর।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)

একজন মা যখন অশ্রুসজল চোখে রাতের শেষ প্রহরে সন্তানের জন্য হেদায়েত, ঈমান ও নিরাপত্তা কামনা করেন; সেই দোয়ার শব্দ হয়তো বাতাসে মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার প্রভাব সন্তানটির ভবিষ্যৎ চরিত্রে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মা-বাবার, বিশেষত মায়ের দোয়ার প্রতিফলন দেখা যায়। ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়াই তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমার বংশধরদেরও। ’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)

এই দোয়ার ধারাবাহিকতাতেই আমরা ইসমাঈল (আ.), ইসহাক (আ.) এবং পরবর্তী নবীদের জীবন দেখতে পাই। আলেমরা বলেন, এক প্রজন্মের দোয়া কখনো কখনো কয়েক প্রজন্ম পর প্রতিফলিত হয়।

শুধু দোয়া নয়, মায়ের আদর্শিক জীবনযাপনও সন্তানের জন্য শক্তিশালী শিক্ষার মাধ্যম। শিশু প্রথমে শোনে না, দেখে; সে মায়ের নামাজ দেখে, কথা বলার ভঙ্গি দেখে, রাগ নিয়ন্ত্রণ দেখে, আল্লাহর ওপর ভরসা দেখতে পায়। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘শিশুর অন্তর কাঁচা মাটির মতো, যা প্রথমে তাতে আঁকা হয়, সেটাই স্থায়ী হয়ে যায়।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)

একজন মা যদি সত্যবাদিতা, ধৈর্য, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতিকে নিজের জীবনে ধারণ করেন; তা সন্তানকে আলাদা করে শেখাতে হয় না। আদর্শ নিজেই শিক্ষা হয়ে ওঠে।

আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মাতা কিভাবে দারিদ্র্যের মধ্যেও ছেলেকে ইলমের পথে অবিচল রেখেছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মায়ের দোয়ার বরকতেই কিভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছিল। এগুলো কোনো রূপক কথা নয়, বরং প্রামাণ্য ইতিহাস।

আজকের মা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, সময়ের স্বল্পতা-সবকিছুর ভেতর দিয়ে তাকে সন্তান গড়তে হচ্ছে। কিন্তু এখানেও ইসলাম তাকে অসহায় রাখেনি, বরং প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি নীরব কষ্টকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।

এক ব্যক্তি কঠোর পরিশ্রম করছিল; তাকে দেখে সাহাবারা বললেন, ‘আহা! যদি এটা আল্লাহর পথে হতো!’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে আল্লাহর পথেই আছে। আর যদি সে তার বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে-ও আল্লাহর পথেই আছে।’ (সিলসিলা সহিহা : ২/৫৩৮)

আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে আজ প্রয়োজন মায়ের দোয়া ও আদর্শকে ‘অদৃশ্য বিষয়’ ভেবে অবহেলা না করা। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার-সর্বস্তরে মাকে সম্মান, সময় ও মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া। কারণ একজন আলোকিত মা মানে একটি আলোকিত প্রজন্ম।

একজন মা হয়তো আলোচনার মঞ্চে নেই, ইতিহাসের শিরোনামেও নেই; কিন্তু তার সিজদার ভেতর লুকিয়ে থাকে জাতির ভবিষ্যৎ। সন্তান মানুষ হবে কী হারাবে; এর অনেকটাই নির্ধারিত হয় সেই নিঃশব্দ দোয়াগুলোতে, যা কেউ শোনে না, শুধু আল্লাহ শোনেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মুছাব্বির হত্যার ঘটনায় প্রধান শ্যুটারসহ গ্রেফতার ৩

সন্তান প্রতিপালনে মায়ের দোয়া ও আদর্শের শক্তি

আপডেট সময় ১০:০৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুদীর্ঘ যাত্রাটি শুরু হয় একজন মায়ের কোল থেকে; কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা অফিসের ডেস্ক থেকে নয়। কাজেই মায়ের সেই কোলই ব্যক্তির প্রথম পাঠশালা, প্রথম মাদরাসা, প্রথম চরিত্র গঠনের কারখানা। পৃথিবীর ইতিহাসে যত মানুষ সাফল্য পেয়েছে, যত মানুষ আলোকিত চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদের পেছনে যদি আলো ফেলে দেখা যায়, দেখা যাবে একজন নীরব সাধিকার অবিরাম দোয়া, ত্যাগ ও আদর্শের ছোঁয়া রয়েছে। তিনই হলেন মা।

আজকের সমাজে সন্তান প্রতিপালনকে শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল আর কোচিংয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ করে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম সন্তান গঠনের ক্ষেত্রে যে মৌলিক শক্তির কথা বলে; তা কোনো বস্তুগত উপকরণ নয়, বরং সে মায়ের দোয়া ও আদর্শিক উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক। এই দুই শক্তিই এমন এক অদৃশ্য ভিত্তি তৈরি করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি মানুষ সারা জীবন টিকে থাকে।

ইসলামে দোয়ার মর্যাদা ব্যাপক বিস্তৃত। এর রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। কিন্তু কিছু দোয়া এমন রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয় : (১) মজলুমের দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া, (৩) সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৬)

এ হাদিসে ‘মা-বাবা’ বলা হলেও ইসলামী স্কলারদের সর্বসম্মত মত হলো, মায়ের দোয়ার প্রভাব আরো গভীর। কারণ সন্তান জন্ম, লালন ও মানসিক গঠনে মায়ের ভূমিকা অধিক প্রত্যক্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সন্তানের অন্তর যে পথে বাঁক নেয়, তা মূলত নির্ভর করে তার ঘরে উচ্চারিত দোয়া ও কথার ওপর।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)

একজন মা যখন অশ্রুসজল চোখে রাতের শেষ প্রহরে সন্তানের জন্য হেদায়েত, ঈমান ও নিরাপত্তা কামনা করেন; সেই দোয়ার শব্দ হয়তো বাতাসে মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার প্রভাব সন্তানটির ভবিষ্যৎ চরিত্রে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মা-বাবার, বিশেষত মায়ের দোয়ার প্রতিফলন দেখা যায়। ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়াই তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমার বংশধরদেরও। ’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)

এই দোয়ার ধারাবাহিকতাতেই আমরা ইসমাঈল (আ.), ইসহাক (আ.) এবং পরবর্তী নবীদের জীবন দেখতে পাই। আলেমরা বলেন, এক প্রজন্মের দোয়া কখনো কখনো কয়েক প্রজন্ম পর প্রতিফলিত হয়।

শুধু দোয়া নয়, মায়ের আদর্শিক জীবনযাপনও সন্তানের জন্য শক্তিশালী শিক্ষার মাধ্যম। শিশু প্রথমে শোনে না, দেখে; সে মায়ের নামাজ দেখে, কথা বলার ভঙ্গি দেখে, রাগ নিয়ন্ত্রণ দেখে, আল্লাহর ওপর ভরসা দেখতে পায়। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘শিশুর অন্তর কাঁচা মাটির মতো, যা প্রথমে তাতে আঁকা হয়, সেটাই স্থায়ী হয়ে যায়।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)

একজন মা যদি সত্যবাদিতা, ধৈর্য, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতিকে নিজের জীবনে ধারণ করেন; তা সন্তানকে আলাদা করে শেখাতে হয় না। আদর্শ নিজেই শিক্ষা হয়ে ওঠে।

আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মাতা কিভাবে দারিদ্র্যের মধ্যেও ছেলেকে ইলমের পথে অবিচল রেখেছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মায়ের দোয়ার বরকতেই কিভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছিল। এগুলো কোনো রূপক কথা নয়, বরং প্রামাণ্য ইতিহাস।

আজকের মা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, সময়ের স্বল্পতা-সবকিছুর ভেতর দিয়ে তাকে সন্তান গড়তে হচ্ছে। কিন্তু এখানেও ইসলাম তাকে অসহায় রাখেনি, বরং প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি নীরব কষ্টকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।

এক ব্যক্তি কঠোর পরিশ্রম করছিল; তাকে দেখে সাহাবারা বললেন, ‘আহা! যদি এটা আল্লাহর পথে হতো!’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে আল্লাহর পথেই আছে। আর যদি সে তার বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে-ও আল্লাহর পথেই আছে।’ (সিলসিলা সহিহা : ২/৫৩৮)

আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে আজ প্রয়োজন মায়ের দোয়া ও আদর্শকে ‘অদৃশ্য বিষয়’ ভেবে অবহেলা না করা। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার-সর্বস্তরে মাকে সম্মান, সময় ও মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া। কারণ একজন আলোকিত মা মানে একটি আলোকিত প্রজন্ম।

একজন মা হয়তো আলোচনার মঞ্চে নেই, ইতিহাসের শিরোনামেও নেই; কিন্তু তার সিজদার ভেতর লুকিয়ে থাকে জাতির ভবিষ্যৎ। সন্তান মানুষ হবে কী হারাবে; এর অনেকটাই নির্ধারিত হয় সেই নিঃশব্দ দোয়াগুলোতে, যা কেউ শোনে না, শুধু আল্লাহ শোনেন।