ঢাকা ১০:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ নতুন দলের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে যারা ইরানের সামনে এখন কেবল দুই পথ—চুক্তি অথবা আত্মসমর্পণ: ট্রাম্প পাঁচ দফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি সরকার দমনে ব্যস্ত, দ্রব্যমূল্য-গ্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: গোলাম পরওয়ার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগদখলের সুযোগ, মন্ত্রিসভায় খসড়া পাশ শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে হুমায়ুন কবির রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘নতুন মাত্রা’ যোগ করেছেন তারেক রহমান: চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার

বিছানার কাছেই লাশ পড়ে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা

শাহাদাত হোসেন ও আশিকুর রহমান রাজু (ডানে)

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

শাহাদাত হোসেন বেসরকারি যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার। গত মাসের একদম শেষের দিকে একটু জ্বর উঠেছিল। খুব সামান্যই তাপমাত্রা ছিল। এরপর একটি প্যারাসিটামল খাওয়ার পর এক রাতেই জ্বর সেরে গিয়েছিল। এরপর তিনি পেশাগত দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু বাড়িতে তার শ্বশুর কয়েকদিনের মধ্যে ব্যাপক জ্বর ও মাথাব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়ার পর ভাবলেন নিজেও একটু পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। দেখা গেল তার কোন উপসর্গ না থাকলেও তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর তার শ্বশুরসহ পুরো পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়েছেন। শাহাদাত হোসেন বলছেন, হাসপাতালে ভর্তির পর তার মনে হয়েছে জীবনে এতটা অসহায় কোনদিন বোধ করেননি।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ জানার পর শুরুতে তিনি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সহকর্মীদের সহায়তায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

তার ভাষায়, ‘হাসপাতালে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে নয়দিন পার করেছি আমরা। ওখানে মনে হয়েছে রোগীরা একেবারে অভিভাবকহীন। আমি খুবই অসহায় বোধ করেছি। দেখতাম চোখের সামনে রোগীরা মারা যাচ্ছে। লাশ ওয়ার্ডেই পড়ে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যেহেতু নির্দিষ্ট ব্যক্তি লাশ দাফন করেন হয়তো তাদের সংখ্যা কম কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, সেকারণে হয়তোবা। কিন্তু এতে একজন অসুস্থ রোগী যে এমনিতেই ভয়ে আছে তার মনের অবস্থা কী হয়?’
শাহাদাত হোসেন বলছেন, হাসপাতালে তিনি খুবই অসহায় বোধ করেছেন। তিনি হাসপাতালে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় একজন চিকিৎসক আসতেন। অনেক দূর থেকে কথা বলে চলে যেতেন।

নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে একটি মানুষকেও পাওয়া যায় না। এরকমও হয়েছে যে নার্স আসেনি বলে একবার সকালের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া হয়নি। চিকিৎসক দিনে একবারও আসেনি সেটিও হয়েছে।

তিনি বলছেন, ‘কিন্তু একজন চিকিৎসকের কথায় আমার ভরসা পাওয়ার কথা। তার কথায় আমার মনোবল বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে মানসিক সাপোর্ট দেয়ার কেউ ছিল না।’

অন্যান্য সুবিধাদির বর্ণনা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তিনি যে ওয়ার্ডে ছিলেন সেখানে একশো মতো রোগী ছিল। এতজন রোগীর জন্য মাত্র তিনটি টয়লেট, তিনটি গোসলখানা। শাহাদাত হোসেন এক পর্যায়ে রোগী বাড়তে শুরু করার পর চিকিৎসকদের অনুরোধ করে তার শ্বশুরসহ বাড়ি চলে আসেন।

দেশে সবচেয়ে প্রথম যে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সাংবাদিক শনাক্ত হয়েছিলেন সেটি ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের। সেখানে ভিডিওগ্রাফার হিসেবে কর্মরত আশিকুর রহমান রাজু আক্রান্তদের একজন।

তিনি বলছেন, ‘শনাক্ত হওয়ার পর যখন কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে যান শুরুতেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কারণ সবাই পিপিই পরে অনেক দূরে দাড়িয়ে আছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনি মনোবল হারাতে শুরু করেন। তাকে একজন ওয়ার্ড বয় একটা পলিথিন ব্যাগে বিছানার চাদর, বালিশ, বালিশের কাভার, টয়লেট টিস্যু আর একটা সাবান দেয়। এগুলো দিয়ে ওয়ার্ড বয় কেচিগেট তালা মেরে চলে গেল। নিজের বিছানাও নিজে গুছিয়ে নিতে হল। প্রথম দিন তার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে কেউ আসেনি। চিকিৎসকদের ফোন করে তিনি সেটি জানানোর পর সাড়ে ৪টার দিকে তার জন্য একটি বক্সে করে খাবার এসেছিল। কোন প্লেট দেয়া হতো না। সেখানে পানি গরম করা থেকে শুরু করে সবকিছুই নিজেকে করে নিতে হয়েছে। এমনকি জ্বর হলে যে মাথায় পানি দিতে হয়, সেসময়ও সহায়তা দেয়ার কেউ ছিল না। একটা বালতি, মগ কিছুই ছিল না, এসব অভিযোগ তিনি করেছেন।

আশিকুর রহমান বলছিলেন, জ্বর নিয়ে যে কয়দিন বাসায় ছিলেন তার মনোবল চাঙ্গা ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই সেটি হারাতে শুরু করেন। জায়গাটা একটা ভূতের বাড়ির মতো। চারপাশে কেউ নাই। সেরে ওঠার পর যেদিন গ্রামের বাড়িতে গেছেন চেনা পরিচিত লোকেরাও তার খবর নেননি। আমি আসতেছি এটা দেখেই বাড়ির কাছে পুরো রাস্তা খালি হয়ে গেল। আমি যেন ভিনগ্রহের কেউ এরকম মনে হচ্ছিল।

এ বিষয়ে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

প্রেক্ষাপট: দুই দিনের সফরে আগামীকাল ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বিছানার কাছেই লাশ পড়ে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা

আপডেট সময় ০৩:২৭:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২০

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

শাহাদাত হোসেন বেসরকারি যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার। গত মাসের একদম শেষের দিকে একটু জ্বর উঠেছিল। খুব সামান্যই তাপমাত্রা ছিল। এরপর একটি প্যারাসিটামল খাওয়ার পর এক রাতেই জ্বর সেরে গিয়েছিল। এরপর তিনি পেশাগত দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু বাড়িতে তার শ্বশুর কয়েকদিনের মধ্যে ব্যাপক জ্বর ও মাথাব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়ার পর ভাবলেন নিজেও একটু পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। দেখা গেল তার কোন উপসর্গ না থাকলেও তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর তার শ্বশুরসহ পুরো পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়েছেন। শাহাদাত হোসেন বলছেন, হাসপাতালে ভর্তির পর তার মনে হয়েছে জীবনে এতটা অসহায় কোনদিন বোধ করেননি।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ জানার পর শুরুতে তিনি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সহকর্মীদের সহায়তায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

তার ভাষায়, ‘হাসপাতালে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে নয়দিন পার করেছি আমরা। ওখানে মনে হয়েছে রোগীরা একেবারে অভিভাবকহীন। আমি খুবই অসহায় বোধ করেছি। দেখতাম চোখের সামনে রোগীরা মারা যাচ্ছে। লাশ ওয়ার্ডেই পড়ে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যেহেতু নির্দিষ্ট ব্যক্তি লাশ দাফন করেন হয়তো তাদের সংখ্যা কম কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, সেকারণে হয়তোবা। কিন্তু এতে একজন অসুস্থ রোগী যে এমনিতেই ভয়ে আছে তার মনের অবস্থা কী হয়?’
শাহাদাত হোসেন বলছেন, হাসপাতালে তিনি খুবই অসহায় বোধ করেছেন। তিনি হাসপাতালে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় একজন চিকিৎসক আসতেন। অনেক দূর থেকে কথা বলে চলে যেতেন।

নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে একটি মানুষকেও পাওয়া যায় না। এরকমও হয়েছে যে নার্স আসেনি বলে একবার সকালের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া হয়নি। চিকিৎসক দিনে একবারও আসেনি সেটিও হয়েছে।

তিনি বলছেন, ‘কিন্তু একজন চিকিৎসকের কথায় আমার ভরসা পাওয়ার কথা। তার কথায় আমার মনোবল বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে মানসিক সাপোর্ট দেয়ার কেউ ছিল না।’

অন্যান্য সুবিধাদির বর্ণনা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তিনি যে ওয়ার্ডে ছিলেন সেখানে একশো মতো রোগী ছিল। এতজন রোগীর জন্য মাত্র তিনটি টয়লেট, তিনটি গোসলখানা। শাহাদাত হোসেন এক পর্যায়ে রোগী বাড়তে শুরু করার পর চিকিৎসকদের অনুরোধ করে তার শ্বশুরসহ বাড়ি চলে আসেন।

দেশে সবচেয়ে প্রথম যে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সাংবাদিক শনাক্ত হয়েছিলেন সেটি ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের। সেখানে ভিডিওগ্রাফার হিসেবে কর্মরত আশিকুর রহমান রাজু আক্রান্তদের একজন।

তিনি বলছেন, ‘শনাক্ত হওয়ার পর যখন কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে যান শুরুতেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কারণ সবাই পিপিই পরে অনেক দূরে দাড়িয়ে আছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনি মনোবল হারাতে শুরু করেন। তাকে একজন ওয়ার্ড বয় একটা পলিথিন ব্যাগে বিছানার চাদর, বালিশ, বালিশের কাভার, টয়লেট টিস্যু আর একটা সাবান দেয়। এগুলো দিয়ে ওয়ার্ড বয় কেচিগেট তালা মেরে চলে গেল। নিজের বিছানাও নিজে গুছিয়ে নিতে হল। প্রথম দিন তার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে কেউ আসেনি। চিকিৎসকদের ফোন করে তিনি সেটি জানানোর পর সাড়ে ৪টার দিকে তার জন্য একটি বক্সে করে খাবার এসেছিল। কোন প্লেট দেয়া হতো না। সেখানে পানি গরম করা থেকে শুরু করে সবকিছুই নিজেকে করে নিতে হয়েছে। এমনকি জ্বর হলে যে মাথায় পানি দিতে হয়, সেসময়ও সহায়তা দেয়ার কেউ ছিল না। একটা বালতি, মগ কিছুই ছিল না, এসব অভিযোগ তিনি করেছেন।

আশিকুর রহমান বলছিলেন, জ্বর নিয়ে যে কয়দিন বাসায় ছিলেন তার মনোবল চাঙ্গা ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই সেটি হারাতে শুরু করেন। জায়গাটা একটা ভূতের বাড়ির মতো। চারপাশে কেউ নাই। সেরে ওঠার পর যেদিন গ্রামের বাড়িতে গেছেন চেনা পরিচিত লোকেরাও তার খবর নেননি। আমি আসতেছি এটা দেখেই বাড়ির কাছে পুরো রাস্তা খালি হয়ে গেল। আমি যেন ভিনগ্রহের কেউ এরকম মনে হচ্ছিল।

এ বিষয়ে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা