বলিউডের চিরসবুজ অভিনেত্রী মধুবালার আসল নাম মমতাজ জাহান বেগম। রূপ ও অভিনয়ের জাদু দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন কোটি ভক্তের হৃদয়। ১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লির এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনিসহ পাঁচজনই অকালে প্রাণ হারান। শৈশবের টানাপোড়েন পেরিয়ে ১৯৪২ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে ‘বসন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ‘নীলকমল’ সিনেমার মধ্য দিয়ে নায়িকা হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। তার রূপ-সৌন্দর্যের তুলনা করতে গিয়ে বারবার সামনে এসেছে মেরিলিন মনরোর কথা।
প্রয়াত এই অভিনেত্রীর বোন মধুর ভূষণ এক সাক্ষাৎকারে মধুবালার জীবন ও তার বাবার সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন অজানা দিক তুলে ধরেন। ভিকি লালওয়ানিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এতে তাদের পরিবারের সদস্যরা গভীরভাবে আহত হন বলে জানান মধুর। বুকভরা বেদনা দিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে মধুর ভূষণ বলেন, “দিলীপ সাহেবের কবরও খুব কাছেই, মাত্র পাঁচ-দশ মিটার দূরে।
তিনি বলেন, “অত্যন্ত কঠোর একজন বাবার কাছে আমরা বড় হয়েছি, তবে তিনি আমাদের প্রচণ্ড ভালোও বাসতেন। মধু আপা বেঁচে থাকতেই আব্বার তিনবার হার্ট অ্যাটাক ও একবার স্ট্রোক হয়েছিল। পাশাপাশি গুরুতর ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত ছিলেন।
মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান তার মেয়ের মৃত্যুশোক ভুলতে পারতেন না। ১৯৭৫ সালে মারা যান মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান।
দীর্ঘ সময় তিনি মেয়ের কবরের পাশে বসে কাঁদতেন।
মধুর ভূষণের ভাষ্যমতে, মধুবালাকে দাফনের সময় তার বাবা প্রচুর পরিমাণে আতর ঢেলে দিয়েছিলেন, যার সুগন্ধ কয়েক মাস ধরে ওই কবরস্থানজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। সাধারণত মুসলিম দাফন রীতিতে এমনটা না থাকলেও শোকাতুর পিতা ভিন্নভাবে মেয়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন। এসব তথ্য স্মরণ করে মধুর ভূষণ বলেন, “মধু আপাকে যখন দাফন করা হয়েছিল, তখন আব্বা তার কবরে এত বেশি আতর ঢেলেছিলেন যে, কয়েক মাস ধরে পুরো কবরস্থান সুগন্ধে ভরে ছিল।
মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান মেয়ের কবরে মার্বেল পাথরের কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা ধর্মীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরবর্তীতে আতাউল্লাহ খানের মৃত্যুর পর সেই কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন পর মধুর ভূষণ জানতে পারেন যে জুহু মুসলিম কবরস্থানেই মধুবালার সমাধি এখনো রয়েছে। সেখানে যাওয়ার পর তিনি সমাধিফলকে ‘মধুবালা’ নাম লেখা দেখতে পান। এই কবরস্থানেই মোহাম্মদ রফি, নওশাদ ও পারভীন ববির মতো তারকারা চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
যদিও ২০১০ সালের দিকে জুহু মুসলিম কবরস্থানে জমি সংকট ও দাফনসংক্রান্ত বিধিবিধানের কারণে অনেক পুরনো কবরের ওপরের স্মৃতিসৌধ ও সমাধিফলক সরিয়ে মাটি সমান করা হয়েছিল। তখন মধুবালার কবরের ওপর নির্মিত মার্বেলের কাঠামোটিও ভেঙে ফেলা হয়, যা নিয়ে মধুর ভূষণ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল, যদি কাঠামো নির্মাণের অনুমতি না-ই থাকে, তবে কেন আগে তা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? তারপরও কবরস্থানে যাওয়া বন্ধ করেননি। কিন্তু আব্বা কীভাবে এই কাজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন বা কী হয়েছিল, তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। ”। কবরের ওপরের অংশ থেকে শুরু করে পাশের অংশও মার্বেল পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, কবরের মাঝের অংশ খোলা রাখা হয়। তাদের বক্তব্য ছিল—কবরটি এভাবে রাখা যাবে না। ”। কবরের মার্বেলের কাঠামো ভেঙে ফেলার পর মধুবালার কবরের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল তার পরিবার। আমি সেখানে গেলে দূর থেকে কবরটি দেখিয়ে দেওয়া হয়। একই কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে আরো কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে।
মধুবালা অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে ‘মহল’ (১৯৪৯), ‘বাদল’ (১৯৫১), ‘তারানা’ (১৯৫১), ‘আমার’ (১৯৫৪), ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ৫৫’ (১৯৫৫), ‘কালা পানি’ (১৯৫৮), ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ (১৯৫৮), ‘বারসাত কি রাত’ (১৯৬০) এবং ‘হাফ টিকিট’ (১৯৬২)। ১৯৫২ সালে মার্কিন সাময়িকী ‘থিয়েটার আর্টস’ তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এছাড়াও অস্কারজয়ী পরিচালক ফ্রাঙ্ক কাপরা তাকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চেয়েও বাবার আপত্তির কারণে ব্যর্থ হন। অবশেষে ১৯৬৯ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে রুপালি পর্দার এই ‘ভেনাস কুইন’ চিরবিদায় নেন। তার নামের সঙ্গে দুটি উপমা প্রায়ই ব্যবহৃত হয়—‘বিউটি উইথ ট্র্যাজেডি’ ও ‘দ্য ভেনাস কুইন অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’। ‘মহল’ সিনেমার সাফল্যের পর মধুবালাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























