মা ইলিশ রক্ষায় সরকার ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, তা অমান্য করে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের কিছু স্থানে ইলিশ শিকার চলছে। বিশেষ করে উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ও রহমতপুর এলাকার ঘাটে রাতের অন্ধকারে ইলিশ ধরা ও কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গভীর রাতে জোয়ারের সুযোগ নিয়ে জেলেরা নৌকা সাগরে নিচ্ছেন এবং ভোরের আগেই গোপনে মাছ হাতবদল করা হচ্ছে। বেশির ভাগ নৌকার মাঝি ও জেলেরা ছুটিতে গেছেন। মাহমুদুন নবী বলেন, ১৪ অক্টোবর রাতে উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে অভিযান চালিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের ধরার চেষ্টা করেন তাঁরা। পরদিন ৩০ অক্টোবর আবার সাগরে যাবেন। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে জানান, জোয়ারের ওপর নির্ভর করে রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরেন জেলেরা। রাতভর ঘাটের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ভোরের অপেক্ষায় ছিলেন। পরে জানতে পারেন, আশপাশের অন্য স্থানে ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় এসব মাছের দামও কম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে বলেন, সূক্ষ্ম ফাঁসের কারেন্ট জালে ছোট আকারের ইলিশ, এমনকি জাটকাও ধরা পড়ছে। সাধারণ সময়ে উন্মুক্ত ‘ডাক’ পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ইলিশ বিক্রি করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার কারণে আয় বন্ধ হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন জেলেরা। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৩২ জন। এর মধ্যে চলতি বছর চার হাজার জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শুরুর ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জেলে এই সহায়তা পাননি। সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় অভাবের চাপে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাড়তি আয়ের আশায় ঝুঁকি নিয়ে সাগরে নামছেন বলে জেলেদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপের বিভিন্ন ঘাটে ৮ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৩টি যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে।
এদিকে, নিষেধাজ্ঞার ১৫ দিনে মৎস্য বিভাগ উপজেলাজুড়ে মোট ২৩টি যৌথ অভিযান চালিয়েছে।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ইলিশ বা জেলেকে হাতেনাতে ধরতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
কেবল দুটি অভিযানে ৩০৫ কেজি ইলিশ ও ৪২ হাজার মিটার জাল জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই জেলেকে জরিমানা করা হয়েছে। মৎস্য বিভাগের মাঠ সহকারী মাহমুদুন নবী জানিয়েছেন, গত বুধবার রহমতপুর ঘাট থেকে একটি অবৈধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ১৫ অক্টোবর একই এলাকায় দুই জেলেকে ইলিশসহ আটক করা হয়। তবে ২১টিতেই কাউকে আটক কিংবা ইলিশ উদ্ধার করা যায়নি।
অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে সন্দ্বীপের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ জানান, নিষেধাজ্ঞার সুফল নিশ্চিতে কোস্টগার্ডের সহায়তা নিয়ে সাগরে টহল বাড়ানো বা লোকবল বৃদ্ধি করে বিভিন্ন স্থানে একই সঙ্গে অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া জেলেদের কার্ড হালনাগাদ করার কাজ চলমান রয়েছে এবং কার্ড না পাওয়া জেলেরা যোগাযোগ করলে তা দ্রুত বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পশ্চিম মাইটভাঙ্গা বেড়িবাঁধ ধরে গাছতলীর দিকে যেতে আরও কয়েকটি জায়গায় একই দৃশ্য দেখা যায়। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পরিবার চালাতে হিমশিম খেলেও তাঁর নামে মৎস্য কার্ড হয়নি।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার অভিযোগ থাকলেও দ্বীপের সব এলাকাতেই কিন্তু এমন পরিস্থিতি নেই। দক্ষিণ সন্দ্বীপের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। সেখানে সারিকাইত ইউনিয়নের বাংলাবাজার ও গাছতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় জেলেরা সাগরে যাওয়ার পরিবর্তে জাল মেরামত এবং নৌকা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। জেলে আবুল বাশার জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই তারা সাগরে ফিরবেন। ২৯ অক্টোবর সব নৌকা সাগরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেখানে জেলেরা জাল বোনা, ছেঁড়া অংশ মেরামত ও মোটা রশি জোড়া দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জাল মেরামত করতে করতেই জেলে আবুল বাশার (৪৫) বলেন, ‘এখন সাগরে যাওয়া বন্ধ, তাই হাতে সময় আছে বলে জাল তুনে (মেরামত) রেডি হইতেছি।
উপজেলার সদারহাটের জেলে দুর্লভ জলদাস জানান, তিনি নতুন জাল বুনছেন যা নিষেধাজ্ঞা শেষে বড় সামুদ্রিক মাছ শিকারে ব্যবহৃত হবে। এমন দৃশ্য দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ ঘাটেই দেখা যাচ্ছে। অনেক জেলের দাবি, তারা নিয়ম মেনেই মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন। তবে যারা কার্ড পাননি, তাদের ক্ষোভ আরও বেশি। যেমন সন্তোষপুর ইউনিয়নের অর্জুন জলদাস জানিয়েছেন, সংসার চালানোর অন্য পথ না থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। উপজেলার সদারহাটের একটি ফাঁকা জায়গায় মোটা সুতার জাল বুনছিলেন দুর্লভ জলদাস (৩৫)।
সরকারি খাদ্যসহায়তা বিতর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন বলেন, জেলেদের সহায়তার জন্য চাল এরই মধ্যে সব এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে চাল বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। আগামী রোববার থেকে এই সহায়তা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























