অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:
ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল আগেই। প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরি ছিলেন মেয়েরাও। ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, সুরাত, বেঙ্গালুরু বা রাঁচির মতো শহর অনায়াসেই যা পেরেছে, বহু চেষ্টা করেও তা পেরে উঠেনি কলকাতা।
অটো রিকশা নিয়ে পথে নামার স্বপ্ন পূরণ হলো না এ শহরের মেয়েদের। কারণ এক শ্রেণির পুরুষ অটোচালক তা চান না। সেই ‘না চাওয়া’-কে অবশ্য পূর্ণ সমর্থন করছেন খোদ অটো রিকশা ইউনিয়নের নেতাই।
তার যুক্তি, অটো চালাতে গেলেই নাকি মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হতে পারেন।
যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন নারী, যেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের তরফে নানা বড়াই করা হয় বার বার, সেখানে এমন ঘটনা কীভাবে মেনে নিচ্ছেন ওপরের স্তরের নেতারা?
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা আইএনটিটিইউসি’র সভাপতি এবং সদ্য রাজ্যসভায় নির্বাচিত শুভাশিস চক্রবর্তী বললেন, ‘এই ধরনের অশ্লীল কথা আমাদেরও কানে এসেছে। ওখানকার অটোচালকদের ধারণা হয়েছে, নারীরা অটো নিয়ে নামলে ওদের কাজ থাকবে না। কিছুতেই বোঝাতে পারছি না।’
স্বামী বাড়ি ফিরতেই রোজ রাতে তার অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন কৃষ্ণা বিজলি। টালিগঞ্জ, রাসবিহারী, হাজরার রাস্তায় হাতে ধরে তাকে অটো চালাতে শিখিয়েছেন স্বামী রবীন। লোকের বাড়ি রান্নার কাজ করা রূপা নায়েকও শিখে নিয়েছিলেন অটো চালানো। তার মনে হয়েছিল, রান্নার কাজে নিরাপত্তা নেই। তার থেকে অটো চালানোই ভালো।
টালিগঞ্জ ফাঁড়ি এলাকার বাসিন্দা তন্দ্রা সাধুখাঁ পরিবারের একমাত্র রোজগেরে। বাংলায় অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনা চালাতে পারেননি। এখন বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি করেন।
২৭ বছরের ওই তরুণীর মনে হয়েছিল, খবরের কাগজ বিলি করে চালানো কঠিন। পাড়ার কাকাদের ধরে তাই অটো চালাতে শিখে নেন তিনিও।
শুধু এরাই নন, অটো চালিয়ে স্বপ্নপূরণের এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন শ্রাবণী সুতার, শম্পা কুণ্ডুদের মতো অনেকেই। কিন্তু তাদের সেই সাধ পূর্ণ হয়নি।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি টালিগঞ্জ-হাজরা রুটে নারীরা গোলাপি অটো রিকশা চালাবেন বলে ঘোষণা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি পুরুষ অটোচালকদের আপত্তিতে।
ওই রুটে তৃণমূল পরিচালিত অটো ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তারক দে বলেন, ‘মেয়েরা অটো চালাবে? তা আবার হয় নাকি? লাইনের এতগুলো ছেলে কখনওই তা মেনে নেবে না। তা ছাড়া, লাইনটা তো ভালো নয়। কেউ ধর্ষণ করে দিলে, তার দায় কে নেবে?’
সেই সঙ্গেই তার সংযোজন, ‘নারীরা বাড়িতেই ভালো। অটো চালানো তাদের কাজ নয়। ছেলেরা কী করে ফেলবে, বলা তো যায় না।’
তবে কি আপনার আপত্তিতেই পথে নামতে পারছেন না নারী অটোচালকেরা?
তারক দে’র উত্তর, ‘কিছু লোক আমাদের না জানিয়ে নিজেরা নাম করার জন্য ওটা করছিল। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝে বন্ধ করে দিয়েছি।’
চালাতে শিখেও অটো নিয়ে পথে নামতে না-পেরে ক্ষুব্ধ রূপা নায়েক বলেন, ‘আমাদের যাতে কেউ অটো ভাড়া না দেয়, সেই চেষ্টা চলছে। ওদের যে কীসের সমস্যা বুঝতে পারছি না। একটা চায়ের দোকানের পাশে অন্য কেউ দোকান করলে কি সেই দোকান চলে না?’
রূপার স্বামী এখন আর তার সঙ্গে থাকেন না। এক ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে রূপা ভাড়া থাকেন হরিদেবপুরে। বাপের বাড়ি টালিগঞ্জ এলাকার ঝোড়ো বস্তিতে। এত দিন বাড়ি বাড়ি রান্নার কাজ করতেন।
তিনি বললেন, ‘অটো রিকশায় রোজগার বেশি। তাই অটোই চালাব ঠিক করেছি। আমরা চালালে অটোর সংখ্যা বাড়বে। তাতে যাত্রীদেরও তো সুবিধা হবে।’
কৃষ্ণার অনুমান, তার স্বামীও ওই রুটেই অটো চালান বলে তাকে বাধা দেয়া হচ্ছে।
তার কথায়, ‘আমার স্বামী ওই লাইনেই অটো চালান। যখন মেয়েরা অটো চালাবে শুনলাম, তখন আমিও রাজি হয়ে গেলাম। শিখেও নিয়েছি। কিন্তু এখন বোধহয় সেটাই আমার কাল হলো। কার এতে কী অসুবিধা, সেটাই তো বুঝছি না।’ তবে হার মানেননি তন্দ্রা। হাজরা রুটে না পারলেও নিজেই টালিগঞ্জ ফাঁড়ি এলাকায় কাটা রুটে রাত আটটা থেকে সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ভাড়ার অটো চালান তিনি। বলছেন, ‘দেখি, কে আটকায়!’
ওই রুটেরই অনেক পুরুষ চালকের আশঙ্কা, মেয়েরা অটো চালালে নারী যাত্রীরা সেই অটোতেই উঠবেন। ফলে মার খাবে পুরুষদের রোজগার।
এক চালকের কথায়, ‘এই রুটে বহু নারী যাত্রী। তারা নারীদের গাড়িতেই উঠবেন। এতেই ভয় পাচ্ছে কয়েক জন। নিরাপত্তার অজুহাতে নারী চালকদের যে বাধা দেয়া হচ্ছে, এটা সরকারের জানা উচিত।’
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন শুনে চেঁচিয়ে উঠলেন রূপা। বললেন, ‘বিপদে পড়লে নিজেরাই প্রতিবাদ করব। তবে বাঁচানোর জন্য কোনও ছেলেকে ডাকব না।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























