অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
২০০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা বগুড়ার পোড়াদহ মেলা বুধবার লাখো মানুষের সমাগমের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এবার স্থানীয় জটিলতায় ঐতিহ্যবাহী এক দিনের পোড়াদহ মেলা স্বল্পপরিসরে বসে। ইজারাগত ঝামেলার কারণে এক জায়গার পরিবর্তে তিন জায়গায় বসেছিল মেলা। একই কারণে নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা।
এদিকে কাল বৃহস্পতিবার একই জায়গায় অনুষ্ঠিত হবে বউ মেলা। পোড়াদহ মেলাটি উত্তরাঞ্চলের মাছ ও মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। একে মাছের মেলাও বলা হয়ে থাকে। মেলা উপলক্ষে এলাকায় ঘরে ঘরে জামাই ও আত্মীয়দের আগমন ঘটে।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে গাবতলী উপজেলার গোলাবাড়ী এলাকার পোড়াদহ নামক স্থানে প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবার অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা। এ উপলক্ষে ওই উপজেলার ঘরে ঘরে জামাই ও আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ জানানো হয়। ঈদসহ অন্য উৎসবে জামাই বা আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ না জানালেও মেলা উপলক্ষে তাদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়।
ঈদে ওই এলাকার প্রবাসীরা না এলেও মেলা উপলক্ষে তারা দেশে আসেন। ঈদ উপলক্ষে ওই এলাকার লোক যত না খরচ করে তার চেয়ে বেশি খরচ করে এই মেলা উপলক্ষে। মেলা থেকে বড় মাছ এবং বড় বড় মিষ্টি এনে সমাদর করা হয় জামাই ও আত্মীয়দের। বুধবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের দিনে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবার মেলায় দেখা গেছে প্রেমিক-প্রেমিকাদেরও।
উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ী বন্দরের পূর্ব ধারে গাড়ীদহ নদী ঘেঁষে পোড়াদহ নামক স্থানে সন্যাসী পূঁজা উপলক্ষে ১ দিনের জন্য এই মেলা বসে। এক দিনের জন্য মেলা হলেও সপ্তহ জুড়েই মেলার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলায়। বিশেষ করে গাবতলী উপজেলায় মেলাটি হওয়ায় এখানে প্রত্যেক পরিবারেরই আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক হাজার ব্যবসায়ীও আসে। মেলায় মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ১টি বাঘাইড় মাছের ওজন ছিল ১০০ কেজি। মূল হাঁকা হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বুধবার ভোররাতের আগেই আড়তে আনা হয় বড় আকারের মাছগুলো। আর ভোররাত থেকে আড়তে আড়তে ছুটে যান খুচরা ব্যবসায়ীরা। তারা মাছ কিনে দোকানে দোকানে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন। বাঘাইড় মাছ ছাড়াও মেলায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াাল, সিলভার কার্প, বিগহেড, কালবাউস, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উঠেছিল।
মাছের পরে মেলায় বরাবরের মতো আকর্ষণ ছিল বাহারি মিষ্টান্ন সামগ্রী। মাছ আকৃতির মিষ্টি, রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপি, নিমকি, তিলের নাড়ু, খই, শুকনা মিষ্টির দোকানেও ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভীড়। এছাড়া দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের মিষ্টি পোড়াদহ মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
বগুড়া জেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও মেলায় দর্শনার্থীদের আগমন ঘটেছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার ডাকবাংলা থেকে মেলায় আসা দর্শনার্থী সামছুল কবির জানান, শখের বসেই প্রতিবারেই পোড়াদহের মেলায় আসি। শুধু কেনাকাটার জন্য নয় এখানে দেখার মতো অনেক কিছুই থাকে। গ্রামগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী অনেক সামগ্রী মেলায় স্থান পায়। কাঠ, বাঁশ তৈরি, বেতের তৈরি চোখ ধাঁধানো আসবাবপত্রসহ সাংসারিক কাজের অসংখ্য সামগ্রী মেলায় সবার নজর কাড়ে।
এদিকে এলাকাবাসী আব্দুস সাত্তার জানান, ঈদ উৎসবের মতো মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত দিয়ে আনতে হয় মেলা উপলক্ষে। এখানে প্রতিটি বাড়িতেই আত্মীয়স্বজনের আগমন ঘটেছে।
সকাল থেকে শুরু হয়ে দিনের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষের আগমন ঘটতে থাকে। মেলার চারপাশের রাস্তায় সকাল ১০টার পর থেকেই প্রচ- রকমের জ্যাম হওয়ায় কোনো যানবাহন মেলার ৩ কিলোমিটারের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি। পুরুষের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ শিশু ও মহিলাকেও দর্শনার্থী হিসেবে দেখা গেছে। মেলার মূল আকর্ষণ দেশী-বিদেশী প্রজাতির বড় মাছ, মিষ্টি, কাঠের তৈরি ফার্নিচারসহ শিশুদের খেলনা, কৃষি সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি মেলায় নাগরদোলা, সার্কাসসহ শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল উল্লেখ করার মত।
মেলার ইজারাদার ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, মেলাটি ১ দিনের জন্য হলেও স্থায়ী হয় ৩ দিনের মতো। প্রায় ২০০ বছরের পুরাতন। এই মেলায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসে। এবারও মেলাটি ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
তিনি আরো জানান, একই জায়গায় কাল বৃহস্পতিবার বউ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কেবল নারীরাই যাবেন। বিক্রেতা ক্রেতা এবং দর্শনার্থী সাবই নারী। ওই মেলায় পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে।
বাগবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক সোহেল রানা জানান, মেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে। জিয়া অর্ফানেস ট্রাস্ট্রের জায়গা খালি থাকায় সেখানেও স্থানীয়রা মেলা বসিয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























