ঢাকা ১১:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘পরিবারের সুখ শান্তিকে তছনছ করে দিয়েছি’: মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি নেত্রী যিশুর মূর্তি ভাঙচুর ইসরাইলি সেনার, বিশ্বজুড়ে তোলপাড় নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল বাংলাদেশ আমি এই মন্ত্রী, এই মন্ত্রণালয়ে যে দুর্নীতি করবে, ২৪ ঘণ্টা থাকতে পারবে না: শিক্ষামন্ত্রী নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সংসদে উদ্বেগের কথা জানালেন হান্নান মাসুদ কাগজপত্র থাকলে সৌদিতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ ১৮টি দেশে কর্মী পাঠানোর চুক্তি হয়েছে: নুরুল হক পরীক্ষা ভীতি দূর করে আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায় সরকার: মাহদী আমিন বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জাপানি প্রধানমন্ত্রীর পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে জনগণকে দেওয়া হবে: তারেক রহমান

যুদ্ধের গুহা থেকে আল-আজহারের শীর্ষপদে, মানবতার নেতা ড. আহমেদ তৈয়ব

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

ইতিহাস কোনো কোনো মানুষকে শুধু জন্ম দেয় না—তাদের নির্মাণ করে সময়ের নিষ্ঠুর হাতুড়িতে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তুতা, স্মৃতি ও সাধনার দীর্ঘ পথে হাঁটিয়ে তারা হয়ে ওঠে একটি যুগের নৈতিক প্রতিনিধি।

শাইখুল আজহার, ইমামুল আকবর ড. আহমেদ তৈয়ব (হাফিযাহুল্লাহ্) তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যার জীবন আধুনিক মুসলিম বিশ্বের ব্যথা, প্রতিরোধ ও বিবেকের এক গভীর ভাষ্য।

ড. আহমেদ তৈয়ব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ৬ জানুয়ারি, মিশরের ঐতিহাসিক লুক্সুর অঞ্চলের এক প্রাচীন গ্রামে। নীলনদের তীরঘেঁষা এই ভূমি শুধু ফেরাউনদের নয়, বরং নবুয়তের স্মৃতি, আলেমদের সাধনা ও সভ্যতার দীর্ঘ উত্তরাধিকার বহন করে।

তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর—একটি পরিচয় যা তার জীবনে গৌরবের অলংকার হয়ে নয়, বরং দায়িত্বের ভার হয়ে উপস্থিত ছিল। এই বংশপরিচয় তাকে শিখিয়েছে বিনয়, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

তার শৈশব কেটেছে অস্থির সময়ের গর্ভে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকায়নি, আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবেশ করছিল নতুন সংঘাতের যুগে। ১৯৫৬ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এক শিশু।

বোমার শব্দ আর বিস্ফোরণের ভয় থেকে বাঁচতে তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাহাড়ের গুহায়। সেই গুহা ছিল না কোনো কাব্যিক রূপক; ছিল যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, যেখানে একটি শিশুর চোখে সহিংসতা প্রথমবারের মতো তার নগ্ন রূপ মেলে ধরেছিল।

এই অভিজ্ঞতা তার জীবনকে ভেঙে দেয়নি—বরং ভিত গড়ে দিয়েছে। সেখান থেকেই তার মনে জন্ম নেয় এই উপলব্ধি যে, অস্ত্র দিয়ে মানুষকে পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ন্যায় ও জ্ঞান ছাড়া মানবতাকে রক্ষা করা যায় না। এই উপলব্ধিই তাকে আল-আজহারের পথে নিয়ে যায়—যেখানে ইসলামকে তিনি খুঁজে পান ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার ধর্ম হিসেবে।

দীর্ঘ অধ্যয়ন, আত্মসংযম ও সাধনার মধ্য দিয়ে ড. আহমেদ তৈয়ব নিজেকে গড়ে তোলেন এমন এক আলেম হিসেবে, যিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করেন কিন্তু সময়কে অস্বীকার করেন না। তার চিন্তায় কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক বিশ্বের জটিল বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আল-আজহারের শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসে—এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠকে তিনি সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত করেন।

শাইখুল আজহার হিসেবে তার অবদান কেবল প্রশাসনিক নয়; তা নৈতিক ও ঐতিহাসিক। তিনি ধর্মের নামে সহিংসতা, চরমপন্থা ও বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তার কণ্ঠে ইসলাম কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে না; কথা বলে ন্যায়, দয়া ও সহাবস্থানের ভাষায়। আন্তধর্মীয় সংলাপ, মানবিক সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে তিনি আজ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নৈতিক কণ্ঠস্বর।

আজ, যখন তিনি ৮০ বছরে পদার্পণ করেছেন, ড. আহমেদ তৈয়ব কেবল আল-আজহারের শাইখ নন—তিনি এক সময়ের বিবেক। যুদ্ধের গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই শিশুটি আজ আল-আজহারের মিনার থেকে বিশ্বমানুষের উদ্দেশে শান্তি ও মানবতার আহ্বান জানান।

তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত নেতৃত্ব জন্ম নেয় না ক্ষমতার করিডরে। তা জন্ম নেয় স্মৃতির ভার, সহনশীলতার সাধনা এবং মানুষের জন্য কিছু করার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা থেকে। ইতিহাস তাই তাকে শুধু একজন আলেম হিসেবে নয়, এক যুগের নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবেই স্মরণ করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

‘পরিবারের সুখ শান্তিকে তছনছ করে দিয়েছি’: মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি নেত্রী

যুদ্ধের গুহা থেকে আল-আজহারের শীর্ষপদে, মানবতার নেতা ড. আহমেদ তৈয়ব

আপডেট সময় ১১:১৫:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক :

ইতিহাস কোনো কোনো মানুষকে শুধু জন্ম দেয় না—তাদের নির্মাণ করে সময়ের নিষ্ঠুর হাতুড়িতে। যুদ্ধ, উদ্বাস্তুতা, স্মৃতি ও সাধনার দীর্ঘ পথে হাঁটিয়ে তারা হয়ে ওঠে একটি যুগের নৈতিক প্রতিনিধি।

শাইখুল আজহার, ইমামুল আকবর ড. আহমেদ তৈয়ব (হাফিযাহুল্লাহ্) তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যার জীবন আধুনিক মুসলিম বিশ্বের ব্যথা, প্রতিরোধ ও বিবেকের এক গভীর ভাষ্য।

ড. আহমেদ তৈয়ব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ৬ জানুয়ারি, মিশরের ঐতিহাসিক লুক্সুর অঞ্চলের এক প্রাচীন গ্রামে। নীলনদের তীরঘেঁষা এই ভূমি শুধু ফেরাউনদের নয়, বরং নবুয়তের স্মৃতি, আলেমদের সাধনা ও সভ্যতার দীর্ঘ উত্তরাধিকার বহন করে।

তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর—একটি পরিচয় যা তার জীবনে গৌরবের অলংকার হয়ে নয়, বরং দায়িত্বের ভার হয়ে উপস্থিত ছিল। এই বংশপরিচয় তাকে শিখিয়েছে বিনয়, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

তার শৈশব কেটেছে অস্থির সময়ের গর্ভে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকায়নি, আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবেশ করছিল নতুন সংঘাতের যুগে। ১৯৫৬ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এক শিশু।

বোমার শব্দ আর বিস্ফোরণের ভয় থেকে বাঁচতে তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল পাহাড়ের গুহায়। সেই গুহা ছিল না কোনো কাব্যিক রূপক; ছিল যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, যেখানে একটি শিশুর চোখে সহিংসতা প্রথমবারের মতো তার নগ্ন রূপ মেলে ধরেছিল।

এই অভিজ্ঞতা তার জীবনকে ভেঙে দেয়নি—বরং ভিত গড়ে দিয়েছে। সেখান থেকেই তার মনে জন্ম নেয় এই উপলব্ধি যে, অস্ত্র দিয়ে মানুষকে পরাস্ত করা যায়, কিন্তু ন্যায় ও জ্ঞান ছাড়া মানবতাকে রক্ষা করা যায় না। এই উপলব্ধিই তাকে আল-আজহারের পথে নিয়ে যায়—যেখানে ইসলামকে তিনি খুঁজে পান ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার ধর্ম হিসেবে।

দীর্ঘ অধ্যয়ন, আত্মসংযম ও সাধনার মধ্য দিয়ে ড. আহমেদ তৈয়ব নিজেকে গড়ে তোলেন এমন এক আলেম হিসেবে, যিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করেন কিন্তু সময়কে অস্বীকার করেন না। তার চিন্তায় কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আধুনিক বিশ্বের জটিল বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আল-আজহারের শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসে—এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠকে তিনি সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত করেন।

শাইখুল আজহার হিসেবে তার অবদান কেবল প্রশাসনিক নয়; তা নৈতিক ও ঐতিহাসিক। তিনি ধর্মের নামে সহিংসতা, চরমপন্থা ও বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তার কণ্ঠে ইসলাম কখনো প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলে না; কথা বলে ন্যায়, দয়া ও সহাবস্থানের ভাষায়। আন্তধর্মীয় সংলাপ, মানবিক সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে তিনি আজ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নৈতিক কণ্ঠস্বর।

আজ, যখন তিনি ৮০ বছরে পদার্পণ করেছেন, ড. আহমেদ তৈয়ব কেবল আল-আজহারের শাইখ নন—তিনি এক সময়ের বিবেক। যুদ্ধের গুহায় আশ্রয় নেওয়া সেই শিশুটি আজ আল-আজহারের মিনার থেকে বিশ্বমানুষের উদ্দেশে শান্তি ও মানবতার আহ্বান জানান।

তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত নেতৃত্ব জন্ম নেয় না ক্ষমতার করিডরে। তা জন্ম নেয় স্মৃতির ভার, সহনশীলতার সাধনা এবং মানুষের জন্য কিছু করার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা থেকে। ইতিহাস তাই তাকে শুধু একজন আলেম হিসেবে নয়, এক যুগের নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবেই স্মরণ করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর