অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
দীর্ঘ দুই যুগ পর চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার দুর্লভপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেন ওরফে মনোয়ার মেম্বার হত্যাকাণ্ডের দায়ে দুই খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত দু’জন হলেন- চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মৃত মুরাদ আলীর ছেলে আব্দুল মোকিম (৬০) ও মৃত আকছেদ আলীর ছেলে গোলাম রসুল ঝড়ু (৬২)।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দু’জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়ার জেল সুপার কামাল হোসেন। ফাঁসি কার্যকরের পর অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতেই মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে, দেরিতে হলেও দোষীদের সাজা কার্যকর হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ারের স্বজনরা।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা যায়, এই দু’জনের ফাঁসি কার্যকরের জন্য বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ফাঁসির আসামি ঝড়ু ও মোকিমের পরিবারের সদস্যদের শেষ সাক্ষাৎ করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝড়ুর পরিবার ও বিকালে মোকিমের পরিবার শেষ সাক্ষাৎ করার জন্য কারাগারে প্রবেশ করে।
কারাগারের নিরাপত্তার জন্য সন্ধ্যার পর থেকেই গোটা এলাকায় পুলিশ ও র্যাবের নজরদারি বাড়ানো হয়। রাতে একে একে কারাগারে প্রবেশ করেন যশোরের জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, সিভিল সার্জন দিলীপ কুমার রায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন-উজ-জামান। রাতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই আসামিকে গোসল করানোর পর তাদের তওবা পড়ান কারা মসজিদের ইমাম রমজান আলী। রাতেই স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের পর তাদের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর তাদের রায় পড়ে শোনানো হয়। নিম্ন আদালতের রায়, আপিল এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি তাদের জানানো হয়। পরে তাদের জমটুপি পড়িয়ে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। রাত ১১টা ৪৫মিনিটে প্রথমে ঝড়ু এবং এর কয়েক মিনিট পর মোকিমের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
তাদের ফাঁসি কার্যকর করেন জল্লাদ মশিয়ার ও লিটু। তারা দু’জনই পৃথক পৃথক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। ফাঁসি কার্যকরের পর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে চিকিৎসক টিম তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর ফরেনসিক টিম পোস্টমর্টেম সম্পন্ন করার পর মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলর আবু তালেব জানান, গোলাম রসুল ঝড়ুর লাশ তার ছেলে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের তরিকুল ইসলাম গ্রহণ করেন। আর মোকিমের লাশ গ্রহণ করেন তার ছেলে মখলেছ আলী। তিনি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার ভোলাডাঙ্গা গ্রামে থাকেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন নিজগ্রাম চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামে চরমপন্থী ক্যাডারদের হাতে খুন হন মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনোয়ার হোসেন। তিনি স্থানীয় কুমারী ইউনিয়ন পরিষদের দু’মেয়াদে সদস্য ও কৃতি খেলোয়াড় ছিলেন। তার খুনের ঘটনায় তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দীন বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় ২১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই হত্যা মামলার এক যুগ পর ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল রায় ঘোষিত হয়। রায়ে ঝড়ু ও মোকিমসহ তিনজনকে ফাঁসি ও দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। পরে উচ্চ আদালত ঝড়ু ও মোকিমের ফাঁসি বহাল রেখে বাকি সবাইকে খালাস দেন।
দেরিতে হলেও দোষীদের সাজা কার্যকর হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ারের স্বজনরা। নিহতের স্ত্রী চায়না খাতুন বলেন, দুই যুগ ধরে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছি। আজ একটু হলেও নিজেকে হালকা বোধ করছি। আর নিহতের পুত্র আলমডাঙ্গার কুমারি ইউপির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দু’যুগ পর হলেও বাবার হত্যার বিচার আর খুনিদের শাস্তি কার্যকর দেখতে পেয়ে স্বস্তি পাচ্ছি। তবে মামলার বাদী নিহতের ভাই মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দিন বলেন, বিচার ও সাজা কার্যকর প্রক্রিয়া বিলম্ব না করে আরও আগেই শেষ করলে ভালো হত।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























