নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের গল্প শুনতে জড়ো হন অনেকে। অনুষ্ঠানে বিশেষ চমক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী ও এস এম সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিক। নিজের একসময়ের শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাস, যে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাকে উৎসাহিত করতে তিনি নিজের হাতে আঁকা একটি ছবি উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। বুধবার নড়াইলে শিখো– জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিল সে। অর্থাভাবে পড়াশোনা আটকে যেতে বসেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সেই পথ অতিক্রম করতে হলে অনেক কষ্ট করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে।
পূজা বিশ্বাস নড়াইল সদর উপজেলার নলদীরচরের বাসিন্দা দিনমজুর নিত্য গোপাল বিশ্বাস ও গৃহিণী দীপ্তি বিশ্বাসের মেয়ে। জরাজীর্ণ ঘরে থেকেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সে স্থানীয় কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। একসময় সে ধর্মদাস মল্লিকের অবৈতনিক ‘চারুকুঠি শিল্পালয়ে’ ছবি আঁকা শিখেছিল। পূজা প্রসঙ্গে ধর্মদাস মল্লিক আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, শহর ছেড়ে গ্রামে অবৈতনিক স্কুল করার সার্থকতা আজ খুঁজে পাচ্ছি। শিল্পচর্চা যে মেধাবীদের পড়ালেখায় বাধা সৃষ্টি করে না, পূজা তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সে আমার প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর ছবি আঁকা ও আত্মোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল, এমনকি আমার সঙ্গে শিল্পকলার মেলায় টেরাকোটা পণ্যও বিক্রি করেছে। মঞ্চেই শিল্পী তার কাঁধ ব্যাগ থেকে ছবিটি বের করে পূজার হাতে তুলে দেন। অনেকে ভাবেন, শিল্পচর্চা মানুষকে পড়ালেখা থেকে দূরে নিয়ে যায়।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে কৃতী শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাস জানায়, সে বড় হয়ে একজন চিকিৎসক হতে চায়। তার লক্ষ্য গরিব ও অসহায় মানুষের সেবা করা। তবে অর্থের অভাবে এই স্বপ্ন পূরণ নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। সে জানায়, ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে পারলে তার মতো অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আছে তার। আজ সেখানকার একজন শিক্ষার্থী এখানে এসেছে, কথা বলেছে।
দেশের ৬৪টি জেলায় ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই সংবর্ধনার আয়োজন করছে। নড়াইলের মূল অনুষ্ঠানটি সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয়। আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন নড়াইল প্রতিনিধি রাজু শেখ। শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে উপবার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়ায় যেন কোনো ধরনের অহংকারের জন্ম না হয়। বড় হওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি শৈশবের শিক্ষক, মা-বাবা এবং যে বন্ধুটি জিপিএ-৫ পায়নি, তাদের ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তোমরা বড় হও, দেশ- বিদেশে গিয়ে বড় চাকরি করো।
অনুষ্ঠানে নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী শিক্ষক ও পটশিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, এসএসসি মাত্র সাফল্যের প্রথম ধাপ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে প্রচুর ধৈর্য ও কষ্টের প্রয়োজন। সমাজে দক্ষ পেশাজীবী থাকলেও ভালো মানুষের অভাব আছে, তাই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। মো. মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান ও শিক্ষক মাহবুবর রশীদ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করে। স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠান।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
















