ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাজুড়ে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ বর্তমানে ৬ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সৃষ্ট মোট ধ্বংসস্তূপের তুলনায় গাজার এই পরিমাণ প্রায় ২০ গুণ বেশি। এত বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ অপসারণের কাজটি এতটাই বিশাল যে, আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং অভিযান হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের প্রাক্কলন বলছে, বর্তমান গতিতে এই ধ্বংসস্তূপ সরাতে সাত থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং এর জন্য প্রয়োজন হবে শত শত কোটি ডলার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, গাজায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন।
ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ সরানো সম্ভব হয়েছে, যা মোট পরিমাণের মাত্র দেড় শতাংশের কাছাকাছি। এর মধ্যে ৩ লাখ টনের বেশি উপাদান পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করেছে, যার ফলে সীমিত আকারে ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দলের চলাচল কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, যেখানে ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। এর ফলে ত্রাণবাহী ট্রাক, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় মানুষের চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট বর্তমান পরিস্থিতির একটি করুণ চিত্র। এক সময়ের ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক এলাকা এখন জনশূন্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষে ঠাসা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ানের ভাষায়, পুরো এলাকা পরিষ্কার করার চেষ্টা অনেকটা হাতে করে সমুদ্র সেঁচে ফেলার মতো দুঃসাধ্য কাজ। এর পাশাপাশি ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে বিধিনিষেধ রয়েছে। অধিকাংশ সরঞ্জাম ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ অজুহাতে আটকে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় প্রকৌশলীরা কেবল পুরোনো সাতটি মেশিন মেরামত করে কাজ চালিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় দোকানপাট, অফিস ও মানুষের ব্যস্ততায় সরগরম থাকা সড়কটি এখন প্রায় জনশূন্য। রাস্তার পাশে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে নোংরা পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে সারাদিন কাজ করে বৈরুত স্ট্রিটের একটি অংশ পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান।
পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা ক্ষতিকারক উপাদান, অ্যাসবেস্টস এবং অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি যৌথভাবে মরদেহ শনাক্তকরণ ও দাফনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে, তবুও এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই মরদেহগুলো উদ্ধারের পাশাপাশি যথাযথ পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারগুলোকে নথিপত্র হস্তান্তরের কাজটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল একটি প্রক্রিয়া।
ধ্বংসস্তূপের এই পাহাড় কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, এটি গাজার মানুষের হারানো ঘরবাড়ি ও স্মৃতির প্রতীক। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ইব্রাহিম দারাদোনার মতো স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমিত পরিসরে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পর পোকামাকড়ের উপদ্রব কিছুটা কমেছে এবং কিছু ছোট ব্যবসায়ী আবার দোকান খুলেছেন। পুনর্ব্যবহৃত কংক্রিট দিয়ে রাস্তা মেরামত এবং গর্ত ভরাট করার কাজ চলছে, যা সামান্য হলেও বাসিন্দাদের যাতায়াত ও শিশুদের খেলার জায়গাকে কিছুটা নিরাপদ করছে। ভবনটির ভেতরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকটি বাস্তুচ্যুত পরিবার।
জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস এবং হ্যালো ট্রাস্টের মতো সহযোগী সংস্থাগুলো বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করার কাজ করছে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটে এই উদ্ধার অভিযান প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার নয়, বরং গাজার পুনর্গঠন, মৌলিক সেবা পুনরায় চালু এবং প্রিয়জনদের দেহাবশেষ উদ্ধারের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। এটি গাজাবাসীর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার প্রথম ধাপ, যা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















