স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে বাজারদর নিয়ে প্রথম সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’য় সেই সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকায় মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম কমেছে’। কিন্তু এর ২২ দিন পরেই, ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়ে ওঠে ‘দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, অতি মুনাফার লালসাই প্রধান কারণ’। সেই শুরু, যা বিগত ৫৫ বছরে কেবলই দীর্ঘতর হয়েছে। বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রীদের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে সবসময়ই থেকেছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ। পুরোনো বেশ কিছু পত্রিকা দেখে ধারণা হলো স্বাধীনতার পর দেশে বাজারদর নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন করেছিল সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকা দৈনিক বাংলা। শুরুটা ছিল এ রকম: ‘রাজধানী ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃ-প্রতিষ্ঠার পর হতে শহরে বিভিন্ন দ্রব্যাদির আমদানী দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন জিনিসের দামও দ্রুত কমতে শুরু করেছে। এসব দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে শাক-সবজি, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি।’। রিপোর্টটির শুরুটা ছিল এ রকম: ‘আজকাল জনজীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন কোন জিনিসের দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী হয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা সরবরাহের অজুহাত দেখিয়ে থাকেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম—এই মোক্ষম যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা অর্থনীতি শাস্ত্রের সূত্র ধরেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে এটা নেহায়েতই স্বাভাবিক। কিন্তু, সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই যে সাড়ে ছ টাকার কেরোসিন তেল চব্বিশ টাকা বিক্রি করতে হবে তার পেছনে অতি মুনাফার লোভ ছাড়া অন্য কোন ন্যায়সঙ্গত যুক্তি নেই। এ ছাড়া এর পেছনে যে মজুতদার ব্যবসায়ী লালসা কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। চাল, ডাল, সরিষার তেল, সাবান, শিশুখাদ্য, সিগারেট, দেশলাই, ব্লেড, ইত্যাদি হরেক রকমের জিনিসের মূল্যই বেড়েছে। কিন্তু আয় পাল্লা দিতে পারেনি ব্যয়ের সঙ্গে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মাসিক মূল্যস্ফীতি যখন ৫০ শতাংশ অতিক্রম করে, তখন তাকে বলা হয় হাইপার-ইনফ্লেশন। অতিমূল্যস্ফীতির উদাহরণও অনেক আছে, যাকে তত্ত্বগতভাবে বলা হয় হাইপার–ইনফ্লেশন।
ইতিহাসের পাতায় হাঙ্গেরিতে ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে জিনিসপত্রের দাম প্রতি ১৫ ঘণ্টায় দ্বিগুণ হওয়ার মতো ভয়াবহ নজির রয়েছে।
এছাড়া ১৯২৩ সালের অক্টোবরে জার্মানিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ, ২০০৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়েতে তা ৭ হাজার ৯৬০ কোটি শতাংশে পৌঁছায়, ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে যুগোস্লাভিয়ায় ছিল প্রায় ৩১ কোটি ৩০ লাখ শতাংশ, ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলায় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ এবং ১৯৮৯ সালের জুলাইয়ে আর্জেন্টিনায় এক মাসে দাম বেড়েছিল ১৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও মূল্যস্ফীতির কবলে পড়েছে বিভিন্ন সময়ে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড মূল্যস্ফীতিকে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কেবল সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে না, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি করে। ১৯৭০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১১ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বড় কারণ। দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ সব সময় অনুভব করে এসেছেন, কেন মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতিবিদেরা নীরব ঘাতক বলে থাকেন। আর এই চাপ কেবল জনজীবনে দুর্ভোগ আনে, তা নয়, রাষ্ট্রও বিপদে পড়ে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পেছনেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বড় ভূমিকা রেখেছিল। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চনা, বৈষম্য, দুর্নীতি ও তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ১৯৯০ সালের পর সবচেয়ে দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দা বা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির কবলে মানুষ নিপতিত। সেখানে সাফল্যের কথা কম, ব্যর্থতার কথাই বেশি।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, অথচ একই সময়ে মজুরি সূচক বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় তা নগণ্য। পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৬ শতাংশ বা ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকলেও যে কোনো ধাক্কায় তারা দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় বেশি হওয়ায় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। শুধু যে নিত্য দিনের অতি আবশ্যকীয় কেরোসিনের দামই বেড়েছে তা নয়।
একটি চারজনের পরিবারের উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়: ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ২০ হাজার টাকা খরচ হতো, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা কিনতে প্রায় ৩০ হাজার ৮০০ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু মজুরি হার বিবেচনায় সেই পরিবারের আয় সর্বোচ্চ ২৯ হাজার টাকায় পৌঁছালেও ঘাটতি থেকে যায় ১ হাজার ৮০০ টাকা। এই সংকটের কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার গত ১২ মাসে নিত্য খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়েছে।
রাজনৈতিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণা ‘গভর্নিং ফর গ্রোথ?’-এ জোনাস ভিলিবাল্ড স্মিট ও জ্যাকব নিরুপ ১৯৬৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০ অর্থমন্ত্রীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, অর্থনীতি ভালো চললে অর্থমন্ত্রীর টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি হলে সরকারবিরোধী জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর ভোট গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জার্মানির তিন গবেষক জোনাথন ফেডারলে, ক্যাথরিন মোহর ও মরিৎস শুলারিক তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের সংকট দ্রুত কাটবে কি না, তা নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসে কোনো আশার বাণী নেই। অর্থমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। তবে নির্বাচিত সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ কত দিন এই চাপ সহ্য করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিনিয়োগের মন্দা কাটিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























