ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে গত ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ঈশ্বরদীতে যে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে আমন ধানের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছে। আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ হেলালুর রহমান জানান, এই তিন দিনে ঈশ্বরদীতে মোট ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার ৫৬ মিলিমিটার, বৃহস্পতিবার ২৬ মিলিমিটার এবং শুক্রবার ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। টানা এই বর্ষণে মাঠের ধানগাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে এবং অনেক জায়গায় শীষসহ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ধানের শীষ এখন পানির ওপর ভাসছে। অনেক ক্ষেত্রে ধান কেটে ঘরে তুললেও শ্রমিকের মজুরি উঠবে না।
মুলাডুলি, দাশুড়িয়া ও সাঁড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠের চিত্র এখন খুবই করুণ। রোববার ও সোমবার উপজেলার মুলাডুলি, দাশুড়িয়া ও সাঁড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
পতিরাজপুর গ্রামের কৃষক মুরাদ আলী মালিথা জানান, তিনি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৫ ও ধানী গোল্ড জাতের ধান চাষ করেছিলেন। তার আশা ছিল প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ ফলন পাবেন। কিন্তু ঝড়ের তাণ্ডবে তার ১৫ বিঘা জমির ধানই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। মুরাদের আশঙ্কা, ধানগাছগুলো পানিতে পড়ে থাকায় এবং কাটার উপযোগী হতে দেরি হওয়ায় ফলন বিঘাপ্রতি চার-পাঁচ মণে নেমে আসতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ তো উঠবেই না, উল্টো বড় ধরনের লোকসানের কবলে পড়বেন তিনি। কোনো জমির ধান তখনো কাঁচা, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনো জমির ধান ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই কাটার উপযোগী হওয়ার কথা ছিল। অনেকের আশঙ্কা, ধান কাটার সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ক্ষতির পরিমাণও তত বাড়বে। বর্তমানে আকাশ মেঘলা থাকায় এবং গরম অনুভূত হওয়ায় আবারও বৃষ্টির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এ অবস্থায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন কৃষকেরা।
কৃষক মুরাদ আলী আরও জানান, বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের জন্য তিনি বাকিতে উপকরণ কিনে চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ধান বিক্রি করে এই বকেয়া টাকা পরিশোধের কথা ছিল। ফসল নষ্ট হওয়ায় সার ও কীটনাশকের দোকানের পাওনা শোধ করা নিয়ে তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। একই রকম বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার কালু সরদার, মিজান মালিথা, মুজাহিদ মণ্ডল, শফি মণ্ডল ও রবিউলসহ আরও অনেকে। তাদের ভাষ্যমতে, স্বাভাবিক অবস্থায় বিঘাপ্রতি যে জমিতে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, এখন সেখানে পাঁচ-সাত মণ ধান পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষকের স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে তার ফসলের মধ্যে। সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেলে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য। এসব উপকরণ বাকিতে নেওয়ায় দামও তুলনামূলক বেশি দিতে হয়।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬৬১ মেট্রিক টন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন জানান, এবার ধানগাছের অবস্থা ও ফলনের সম্ভাবনা বেশ ভালো ছিল। বিশেষ করে ব্রি-১০৩ জাতের ধানের উৎপাদন বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ মণ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কার্তিকের এই অসময়ের ঝড়-বৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছেন। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে জমির পানি সরিয়ে ধান দ্রুত ঘরে তোলার চেষ্টা চালালেও, শ্রমিক সংকট ও মজুরির বাড়তি খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ ধানের বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ার শঙ্কায় অনেকেই সরকারি সহায়তার আবেদন জানাচ্ছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























