দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আবদুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে অর্জিত সম্পদ থেকে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগটি আইন ও বিধি মোতাবেক তদন্ত করা হচ্ছে।
শেখ আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে কাতারে বিনিয়োগ করেছেন এবং সেখানে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। তদন্তে জানা গেছে, কাতারে তার ‘ট্রাভেল চ্যানেল অ্যান্ড ট্যুরস’ নামে একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া কানাডা ও দুবাইয়েও তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। কাতারের রেসিডেন্সি পারমিট অনুযায়ী তার পেশা হিসেবে ‘প্রকল্প প্রকৌশলী’ উল্লেখ রয়েছে এবং তার পারমিটের মেয়াদ ছিল ১৪ জুন ২০২৫ পর্যন্ত। দোহায় তার বসবাসের ঠিকানায় পাওয়া নথিপত্রে তার ন্যাশনাল অ্যাড্রেস সার্টিফিকেটও রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও পেয়েছেন। এদিকে অনুসন্ধানে আবদুল হান্নানের কাতারের কিছু নথি ও ছবি এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। রেসিডেন্সি পারমিটে ‘ঝযধরশয অনফঁষ ঐধহহধহ’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে তার জন্ম তারিখ ১ জুন ১৯৬৩। নিয়োগকর্তা হিসেবে একটি ব্যবসা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কথা রয়েছে। তার পাসপোর্টের মেয়াদ ২০৩৪ সাল পর্যন্ত রয়েছে। আরেকটি ন্যাশনাল অ্যাড্রেস সার্টিফিকেটে একই নাম ও একই আইডি নম্বর দেখা যায়। ঠিকানা হিসেবে দোহার আল ফুরুসিয়া এলাকার নাম রয়েছে। ভিসাটি ২০২২ সালে সিঙ্গাপুরে ইস্যু করা হয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল ২০২৫ সাল পর্যন্ত।
দুদকের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, শেখ আবদুল হান্নান ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। মার্কিন-ইরান সংঘাত এড়াতে তেহরানে কাতারি প্রতিনিধি দল।
তার ছয়টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। গত বছরের ২৭ জুলাই দুদক শেখ আবদুল হান্নান ও তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করে। তাহমিদার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩৪ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে, যার বিপরীতে বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৭ টাকা। এছাড়া তার ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই সময় এসব হিসাবে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৩২২ টাকা ছিল। দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা জানান, তাহমিদার কানাডার ভিজিটর (ই-১) ভিসার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তের স্বার্থে আদালত শেখ আবদুল হান্নান, তার স্ত্রী ও তাদের সন্তানের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। এর মধ্যে হান্নানের পাঁচটি, তার ছেলের নামে একটি এবং স্ত্রীর নামে ৩২টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। বিদেশে সম্পদ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের ২৩ মে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এবং ২১ জুন ইন্টারপোলের এনসিবি শাখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। পরদিন ৬ মে তার জমি, ফ্ল্যাট, ভবন ও ব্যাংক হিসাব জব্দ বা অবরুদ্ধ করার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশে ইতিমধ্যে হান্নানের স্থাবর সম্পত্তি জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খিলক্ষেতে ছয় তলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় দুটি ফ্ল্যাট (৬৯৯ ও ৮২৩ বর্গফুট), মিরপুর ডিওএইচএসে ২ হাজার ২৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মিরপুরে নির্মাণাধীন সাত তলা একটি ভবন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমি। এছাড়া গত বছরের ৫ মে আদালত হান্নান ও তার পরিবারের তিন সদস্যের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৮৪ সালে বিমানবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত শেখ আবদুল হান্নান ২০২১ সালের ১২ জুন বাহিনীর ১৬তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৪ সালের ১১ জুন অবসরে যান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম আইন অনুযায়ী চলমান রয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে। এটি ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ইস্যু করা হয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















