রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আগামী রোববার থেকে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এই রুটে ৭৮০টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন। দুটি রুটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ও নন–এসি বাস চালানো হবে। বাসের নির্ধারিত থামার স্থান (স্টপেজ), কাউন্টারভিত্তিক টিকিট, ই-টিকেটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে বাস চলাচল। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কমিটি নতুন পরিকল্পনা করে।
পুরোনো বাসে নতুন শুরুর পরিকল্পনা
ডিটিসিএ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শুরুতে নতুন বাসের পরিবর্তে বর্তমানের পুরোনো বাসগুলোই রঙ করে নামানো হবে। এনায়েত উল্যাদের বিদায়, ঢাকার পুরোনো বাসের নতুন নিয়ন্ত্রক।
পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ছয়টি আলাদা কোম্পানি। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র পুরোনো বাস দিয়ে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করলে প্রকৃত রুট রেশনালাইজেশন সম্ভব নয়; বরং এর জন্য স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায় ব্যবস্থা, আধুনিক বাস ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস নিশ্চিত করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ শুরু হচ্ছে। ওই বৈঠকে ডিটিসিএর পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাড়া আদায়সহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রেক্ষাপট
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৮ অক্টোবর রাজধানীর বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পর্যায়ক্রমে পুরো ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে জানিয়ে মশিউর রহমান বলেন, বাসমালিকেরা কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, সেটি দেখা হবে।
এর আগে ২০২১ সালে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠন এবং ২৭৮টি রুট পুনর্বিন্যাস করে ২২টি রুট নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
সে সময় ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহন চালু হলেও অন্য কোম্পানির বাস যুক্ত করতে না পারায় তা ব্যর্থ হয়।
এছাড়া ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর রেশনালাইজেশনের মূল উদ্যোগটি থমকে গিয়েছিল।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই কার্যক্রম নতুন করে গতি পায়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোও পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
নতুন রুটে বাস বন্টন ও কোম্পানি
- গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির (২৬.৪৭ কিমি) রুটে ২৫৩টি নন-এসি বাস চালাবে ভিআইপি পরিবহন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই পথে শৃঙ্খলা আনতে ‘গোলাপি’ রঙের বাস চালু করা হয়েছিল, যা ব্যর্থ হয়।
- মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ (১৭.১৮ কিমি) রুটে ১৩৩টি বাস পরিচালনা করবে চিড়িয়াখানা সিটি বাস কোম্পানি।
- কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে ডেমরা (২৪.৪৯ কিমি) রুটে ৭০টি বাস পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ।
- ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর (২৫.৫ কিমি) রুটে ১৫০টি বাস চালাবে ফোর স্টার বাস লাইন।
- ঘাটারচর থেকে উত্তরা (প্রায় ৩০ কিমি) রুটে ১৯০টি বাস চালাবে পিএনপি সিটি সার্ভিস।
- টঙ্গী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির (২২.৮৯ কিমি) রুটে ২০টি এসি বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যার পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ‘ঢাকা চাকা’।
এসব রুটে আগে থেকেই ভিআইপি, বিকাশ, দিশারী, তানজিলসহ একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করছে। নতুন ব্যবস্থায় অন্য কোম্পানির বাস চলাচল কতটা কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যমান মালিকদের একটি রুটের আওতায় এনে শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তায় উন্নত বাস নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই পরিবহন সংকট দূর করে ঢাকায় শৃঙ্খলা ফিরবে কি না।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 














