প্রয়াত গিটারসম্রাট আইয়ুব বাচ্চুর জীবন ও সংগীতযাত্রাকে ঘিরে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়োজন বলে মনে করছেন গীতিকবি ও সংগীত প্রযোজক আসিফ ইকবাল। তাঁর মতে, আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের প্রতিটি বাঁক—চট্টগ্রামের রবিন থেকে সংগীতের জগতে পদার্পণ, প্রথম অ্যালবামের ব্যর্থতা, সোলস ব্যান্ড ছেড়ে ২৮ বছর বয়সে নিজস্ব ব্যান্ড গঠন, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ, ২০১২ সালে সিসিইউতে ভর্তি হওয়া এবং ৫৬ বছর বয়সে প্রয়াণ—সবই এক পূর্ণাঙ্গ সিনেমার গল্প। চিত্রনাট্যকারের নতুন কোনো কাল্পনিক গল্পের প্রয়োজন নেই, বরং এই বাস্তব ঘটনাগুলোকেই শৈল্পিকভাবে সাজিয়ে পর্দায় তুলে ধরা সম্ভব। চট্টগ্রামের রবিন (নিজের আরেক নাম) থেকে গিটারসম্রাট, মাঝখানে ব্যর্থ প্রথম অ্যালবাম, সোলস ছেড়ে ২৮ বছর বয়সে নিজের ব্যান্ড, ১৯৯২-এ দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম, ২০১২-তে সিসিইউ, নিজের সতীর্থদের সঙ্গে বিরোধ, আর ৫৬ বছরে মৃত্যু। পরে সঙ্গে আলাপে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার দিকটাও ব্যাখ্যা করেন আসিফ ইকবাল।
আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার মগবাজারের একটি ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ স্মরণসভায় এই মন্তব্য করেন আসিফ ইকবাল। অনুষ্ঠানটির যৌথ আয়োজক ছিল চট্টগ্রাম মিউজিশিয়ানস ক্লাব ঢাকা, আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন ও তাঁর বন্ধুমহল। শিল্পীকে স্মরণ করে তিনি বলেন, একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকেন। আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে আলোড়িত করবে এবং নতুন সংগীতশিল্পীদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। এভাবেই তিনি বেঁচে থাকবেন, এমনকি আজকের প্রজন্মের মানুষগুলো একদিন না থাকলেও।
আইয়ুব বাচ্চুর অসম্পূর্ণ স্বপ্নের প্রসঙ্গ টেনে আসিফ ইকবাল জানান, প্রয়াত এই শিল্পীর দুটি বড় স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে। একটি হলো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১৫ লাখ দর্শক নিয়ে কনসার্ট করা, অন্যটি তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি গিটার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জীবনীভিত্তিক সিনেমার মাধ্যমে প্রথম স্বপ্নটি পর্দায় পুনর্নিমাণ করা সম্ভব এবং সেই সাথে দ্বিতীয় স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের পথও প্রশস্ত হতে পারে। এছাড়া আইয়ুব বাচ্চুর হাতে থাকা প্রায় ২০০ অপ্রকাশিত গান ধাপে ধাপে প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি কথা বলেন, যা সিনেমার জন্য একটি বড় সম্পদ হতে পারে। চিত্রনাট্যকারকে কিছু বানাতে হবে না, শুধু সাজাতে হবে।’।
সংগীতশিল্পীদের বায়োপিক নিয়ে দীর্ঘ আক্ষেপ ঝরে পড়ে আসিফ ইকবালের কণ্ঠে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বায়োপিক নির্মিত হলেও সংগীতশিল্পীদের জীবন নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। তিনি ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ সিনেমার দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, সংগীতনির্ভর জীবনীচিত্রের বড় সুবিধা হলো দর্শকরা আগে থেকেই শিল্পীর গানগুলো সম্পর্কে জানেন, যা সিনেমাটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তরুণরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলসের মাধ্যমে ‘রুপালি গিটার’ গানটিকে চিনলেও তাঁর পুরো জীবনের সংগ্রাম ও সংগীতের দর্শন সম্পর্কে খুব কমই জানেন। ফলে গান ও শিল্পীর জীবনের গল্পকে একসঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ থাকে।
নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা উল্লেখ করে আসিফ ইকবাল জানান, তাঁর লেখা ‘১০০টা স্বপ্ন’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আজ সেই শিল্পীর নিজের স্বপ্নগুলো পর্দায় ফুটে উঠবে কি না, সেই অপেক্ষায় এখন তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। আইয়ুব বাচ্চুর জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তাতেই স্পষ্ট হয় এই শিল্পী মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিয়েছিলেন। সেই ভালোবাসাকে স্মরণানুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে সিনেমার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উক্ত অনুষ্ঠানে সংগীত ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, পার্থ বড়ুয়া, পিলু খান, রফিকুল আলম, ফৌয়াদ নাসের বাবু, লাবু রহমান, রিপন খান, গোলাম মোর্শেদ, আসিফ আকবর, কোনাল, জয় শাহরিয়ার, সাব্বির, কিশোর, শফিক তুহিন, জুয়েল মোর্শেদ, তরুণ মুন্সি ও রাশেদ। এছাড়া আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























