সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র জানিয়েছেন, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই লক্ষ্যবস্তুগুলোকে মাঝপথেই শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য, খামিস মুশাইত শহরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবারও হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন অবস্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের কথা জানিয়েছিল। ক্রমবর্ধমান এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় মক্কা, জেদ্দা এবং প্রধান তেল বন্দর ইয়ানবুতে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলে ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা লোহিত সাগরে নৌ অবরোধ আরোপ করে বিভিন্ন ট্যাংকারে হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক নিন্দার মধ্যেই আবার এসব হামলা চালানো হলো। গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এই হামলাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ফ্রান্সের দূত ও নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি জেরোম বনফোঁ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা বেসামরিক নাগরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হুতিদের ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব হামলায় শিশু ও নারীসহ বেশ কিছু বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।
হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হেজাম আল-আসাদ এই অভিযান প্রসঙ্গে বলেছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী এসব আক্রমণকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং এক ধরনের ছোট পরিসরের মহড়া হিসেবে দেখছে। তবে জুলাই মাসে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, আগস্ট মাস থেকে ইয়েমেনে অন্তত ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭০ হাজারই শিশু। জুলাইয়ে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়। এরপর ইয়েমেনকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। এদিকে হুতি বাহিনী ইয়েমেনি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে স্থল অভিযান চালাচ্ছে, তাতে দেশটিতে নতুন করে মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে মিত্র দেশগুলো। গত আগস্টে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় রিয়াদকে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরা একটি জরুরি বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। এই চুক্তির শর্তানুসারে, এক দেশের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে। কৌশল নির্ধারণে তুরস্কের সেনাপ্রধান জেনারেল সেলসুক বায়রাকতারোগলু ইতিমধ্যে সৌদি আরব সফর করছেন। তবে তুরস্কের পার্লামেন্টে এখনো চুক্তিটি অনুমোদিত না হওয়ায় আঙ্কারার সহায়তা আপাতত দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি পর্যায়ে সীমিত থাকবে। সেখানেই তিন দেশের সেনাপ্রধানেরা আলোচনায় বসার কথা।
এই সংকটের মধ্যে সৌদি আরবের বন্দর রক্ষায় সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু তেল বন্দর রক্ষায় রাডার ও আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ সেনাসদস্য পাঠানো হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য কোনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়। এদিকে, সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি হুতিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য সেনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে হুতিদের ইয়েমেন থেকে নির্মূল না করা পর্যন্ত সেনাদের জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের কড়া নির্দেশ দেন সৌদি আরবের শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড মুফতি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 


















