প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভাণ্ডারের সামগ্রী এমপি নন, বিতরণ করবেন ডিসি

591

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডার থেকে ২০০ বা ২৫০ সিনথেটিক শাড়ি, ৬০ পিস থ্রি-পিস ও ৫৫ পিস বাচ্চাদের তৈরি পোশাক (বিভিন্ন ধরনের) বরাদ্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর এসাইনমেন্ট অফিসার মোহাম্মদ শামীম মুসফিক আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এই শাড়ি, থ্রি-পিস ও বাচ্চাদের পোশাক এমপিরা নিজেরা বিতরণ করতে পারবেন না। এগুলো বিতরণ করবেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)।

গত ১৩ মে এই চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। সরকারদলীয় একাধিক এমপি এ ধরনের চিঠি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকেই এমপি-মন্ত্রীদের কর্তৃত্ব খর্ব করা হচ্ছে।

স্পষ্টতই শেখ হাসিনা করোনা মোকাবেলাতে জনপ্রতিনিধিদেরকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন। এমপিদের কোন ভুমিকা নেই। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে করোনা মোকাবেলায় জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রনিধিদেরকে অপমান করা হচ্ছে। তাদেরকে বিশ্বাসও করা হচ্ছে না।

এ চিঠি হাতে পাওয়ার পর একাধিক এমপি জানিয়েছেন, আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ত্রাণ সামগ্রী শাড়ি, থ্রি-পিস বিতরণের জন্য আমাদের হাতে হাতেই তুলে দেওয়া হতো। কিন্তু এবার জেলা প্রশাসকের হাতে দেওয়া হচ্ছে। আবার জেলা প্রশাসকগণ যথাসময়ে তুলতে না পারলে সেগুলো আমাদের নিজ দায়িত্বে তুলে প্রশাসকদের মাধ্যমে বিতরণ করতে বলা হয়েছে।

তারা বলছেন, এমপিরা ২০০/২৫০ পিস সিনথেটিক শাড়ি, ৬০ পিস থ্রি-পিস ও ৫৫ পিস বাচ্চাদের তৈরি পোশাক আত্মসাৎ করবেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে দেশে?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঈদ উপলক্ষে দুঃস্থ মানুষদের জন্য যে শাড়ি-কাপড় বরাদ্দের চিঠি দেয়া হয়েছে, সেখানে এমপিদের শুধু পরামর্শকের ভুমিকা দেয়া হয়েছে। আর জেলা প্রশাশকদের এগুলো বণ্টন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও নানা রকম কথাবার্তা আছে। অনেক এমপি নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখেছেন। অনেক এমপি প্রকাশ্যেই হতাশা প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনা কেন এমপিদের নিষ্ক্রিয় করেছেন? এটি কি তার রাজনৈতিক কৌশল? করোনার মধ্যেও কি তিনি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের জন্য একটি কৌশল গ্রহণ করেছেন এবং এই কৌশলটি তিনি করোনাকালে ব্যবহার করছেন?

এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশে রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা কমে গেছে। রাজনীতিবিদদের বদলে এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতির মাঠ দখল করে নিয়েছেন। বিশেষ করে এমপি হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের তারা অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকেই। রাজনীতি এখন একটি ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলের টিকেট কেটে মনোনয়ন নিচ্ছেন এবং এমপি হয়ে নানা রকম ব্যবসায়ে প্রভাব বিস্তার করে সেই টাকা উঠিয়ে নিচ্ছেন। অনেক এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। গরীব মানুষের টাকা, ত্রাণের টাকা, রিলিফের টাকা, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে অনেক এমপিদের বিরুদ্ধে। এমপি হবার জন্য যেমন তাদেরকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে, তেমনি এমপি হয়ে সেই টাকা তুলে নেয়ার একটি দুষ্টু চক্রে পড়েছে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া। করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনা কি এই প্রক্রিয়াকে শুদ্ধ করার কৌশল নিয়েছেন?

এখন যখন এমপিদেরকে তিনি নিষ্ক্রিয় করেছেন, তখন এমপিদের মধ্যে অনেককেই বলতে শোনা যাচ্ছে যে, এমপিদের সেই মধু আর নেই, সেই মর্যাদাও নেই।  এমপিদেরকে এখন বসতে হচ্ছে জেলা প্রশাসকদের পাশে। এটা অনেক এমপির কাছে অপমানজনক এবং হতাশাজনক। ফলে অনেকেই মনে করবেন যে এমপি হলে যে সমাজে মর্যাদা থাকে এবং এলাকায় প্রভাব থাকে সেই প্রভাব এখন আর আগের মত নাই। এই অবস্থা কিছুদিন চললে অনেক এমপি দেখা যাবে যে তাদের নির্বাচনী এলাকাতেই যাবেন না। কারণ এলাকায় তিনি আর মধ্যমণি থাকবেন না। ফলে এমপি হবার আকর্ষণ কমে যাবে।

এমপিদের এখন ত্রাণ থেকে শুরু করে অনেক কিছুতেই নিষ্ক্রিয় করে রাখার ফলে তাদের কথা প্রশাসন শুনবে না। এমপিরা অনেক টেন্ডারে অনেক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে নয় ছয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন টেন্ডারে তাদের নিজস্ব ব্যক্তিদেরকে দিয়ে অবৈধভাবে কাজ পাওয়ার জন্য তাদের তদ্বিরের কথা নতুন নয়। অনেক সময় আসামী এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের জামিন নেয়ার ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু করোনায় শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এমপিরা ‘নোবডি’। এই ‘নোবডি’ হওয়ার কারণেই তাদের কথা কেউ শুনবে না। তারা চাকরির তদ্বির করলে প্রশাসন সেটা ছুড়ে ফেলে দেবে। তারা কোন বন্দীকে মুক্তি দেয়ার জন্য বললে পুলিশ মুখ ঘুড়িয়ে নেবে। তারা কোন টেন্ডারের জন্য তার নিজের বা অন্যকে সুপারিশ করলে সেই সুপারিশ প্রত্যাখ্যাত হবে। ফলে এমপিরা আম জনতার মত হয়ে যাবে। শুধুমাত্র যারা জনগনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, জনগণকে নিয়ে কাজ করে তাদের মধ্যে এই রকম দুর্নীতি বা প্রভাব বিস্তারের মনোভাব নেই তারাই ঠিক মত কাজ করতে পারবে। ফলে এই এমপিত্ব বা সংসদ সদস্য হওয়া যে একটি লাভজনক ব্যাপার, একটি বাণিজ্যিক ব্যাপার, এই ব্যাপারটি আর থাকবে না। যার ফলে অনেক ব্যবসায়ীরা আর এমপি হতে আগ্রহী হবেন না। কারণ যেখানে টাকা নেই, ক্ষমতা নেই সেটি গ্রহণ করে কি লাভ? ফলে যারা সত্যিকারের রাজনীতি করেন, যারা জনকল্যাণ করেন, যারা মানুষের জন্য কাজ করতে আগ্রহী তারা আস্তে আস্তে এই জায়গাগুলো দখল করে নেবেন। ফলে রাজনীতিতে নীরবে একটি শুদ্ধি অভিযান হবে। যেই শুদ্ধি অভিযানে যারা বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রাজনীতিতে আসেন, যারা প্রভাব প্রতিপত্তির বলয় তৈরি করতে এমপি হন, তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দূরে সরে যাবেন।

তখন যোগ্য, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এমপি এবং জনপ্রতিনিধি হবেন। তারা যেমন অনেক টাকা পয়সা খরচ করে হবেন না, তাই তারা টাকা পয়সার লোভও করবেন না। জনপ্রতিনিধিদের যে মূল কাজ জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা, সেই কাজেই তারা মনোনিবেশ করবেন।

শেখ হাসিনা কি তাহলে বুঝে শুনেই এমপিদেরকে নিষ্ক্রিয় করছেন? ব্যবসায়ী, কালো টাকার মালিক এবং কলুষিত ব্যক্তিদের থেকে রাজনীতিকে উদ্ধারের জন্যই কি তিনি এই করোনা কালকে ব্যবহার করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদেরকে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।