আকাশ আইসিটি ডেস্ক:
নামেই লিমিটেড কোম্পানি। জয়েন্ট স্টকে তাদের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। ওয়েবসাইট নেই। অথচ অস্তিত্বহীন এই দুটি কোম্পানি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের কাজ পাচ্ছে। যুগান্তরের বিশেষ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৪ সালে ১৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পটি হাতে নেয় তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ।
বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বেকার জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চারটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ১২টি আইটি প্রতিষ্ঠানকে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর কার্যাদেশ দেয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ ও বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়ানোর অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় ৩১৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ধরে দ্বিতীয় সংশোধনীর অনুমোদন দেয় একনেক। অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে ১৩৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
সংশোধনীতে প্রকল্পের সময়সীমা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৫ দিনব্যাপী ২০ হাজার নারীকে মৌলিক প্রযুক্তি বিষয়ে এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ২ হাজার ৯০০ জনকে আউটসোর্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে মূল্যায়ন কমিটির চূড়ান্ত তালিকায় অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেডের নাম দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৮৪০ জনকে বিশেষায়িত আউটসোর্সিং কাজে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ; বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ৫৩ হাজার জনকে প্রফেশনাল আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ এবং আউটসোর্সিং বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১ হাজার ৯২০ জন গণমাধ্যমকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা রয়েছে।
তবে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে শর্টলিস্ট (সংক্ষিপ্ত তালিকা) প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ অনুসন্ধানে জানা গেল, মিথ্যা লিমিটেড কোম্পানির নাম দিয়ে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের কাজ পাচ্ছে দুটি প্রতিষ্ঠান।
লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা’ হিসেবে ‘গুণগতমান ও ব্যয়ভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি’ অনুসরণ করে ১৫টি লটের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য গত বছর ২০ নভেম্বর দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে মূল্যায়ন কমিটির চূড়ান্ত তালিকায় অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেডের নাম দেখা যাচ্ছে।
প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশনস অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) দাখিলের নির্ধারিত সময় ছিল ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। ১৫টি লটের কাজ পাওয়ার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান আবেদন করে তাদের মধ্যে চতুর্থ ও দ্বাদশ নম্বর লটও যৌথভাবে ইওআই দাখিল করে।
চতুর্থ লটে চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ পাচ্ছে মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেড এবং তাদের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের অন্য দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইজি টেকনোলজি লিমিটেড এবং অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেড।
দ্বাদশতম লটে চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ পেয়েছে মিলেনিয়াম সিস্টেম সল্যুশন লিমিটেড এবং তাদের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের অন্য তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিউচার জেনারেশন, আইটি সল্যুশন এবং পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেড।
এ দুটি লটের মধ্যে অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেড এবং পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মিথ্যা লিমিটেড কোম্পানির কাগজপত্র দাখিলের অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই শেষে ৬ মে ইওআই প্রস্তাব মূল্যায়ন করে এই দুটি প্রতিষ্ঠানসহ ১৫টি লটের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে।
১৬ জুলাই কাজ পাওয়ার জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেও ৪ অক্টোবর জয়েন্ট স্টকে আবেদন করে অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেড নামে ছাড়পত্র পাওয়া গেছে।
এরপর ৭ মে তাদেরকে রিকুয়েস্ট ফর প্রোপোজাল (আরএফপি) প্রদান করে। ১৬ জুলাই তাদের আর্থিক প্রস্তাবও উন্মুক্ত করে নির্বাচিত ঘোষণা করে এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য খসড়া চুক্তিও স্বাক্ষর করে।
অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এ দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে জয়েন্ট স্টকে কোনো কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন নাই। জয়েন্ট স্টকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায়ও তাদের কোনো নাম নেই।
বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য গত ৪ অক্টোবর অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেড এবং পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেড কোম্পানীর নামের ছাড়পত্র চাওয়া হলে জয়েন্ট স্টক নামের ছাড়পত্র অনুমোদন করে।
এ বিষয়ে জানতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জুয়েনা আজিজকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক ইসমাইল হোসেনকে ফোন করলে তার সেল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
এদিকে অভিযুক্ত অ্যালান টেকনোলোজি প্রাইভেট লিমিটেডের মূল কোম্পানি মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোফাখখরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘অ্যালান টেকনোলোজি অবশ্যই লিমিটেড কোম্পানি।’
১৬ জুলাই কাজ পাওয়ার জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেও ৪ অক্টোবর জয়েন্ট স্টকে আবেদন করে পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেড নামে ছাড়পত্র পাওয়া গেছে।
প্রমাণ কী? জানতে চাইলে মোফাখখরুল বলেন, ‘তাদের ওয়েবসাইট দেখেন।’ ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলা হলে তিনি এসএমএস করে পাঠাবেন বলে জানান।
কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কারো নম্বর আছে কিনা জানতে চাইলে তাও দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর তাকে এসএমএস করে ওয়েবসাইটের ঠিকানা চাইলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অপর অভিযুক্ত কোম্পানি পারছুজা ইঞ্জি. উন্নয়ন লিমিটেডের মূল কোম্পানি মিলেনিয়াম সিস্টেম সল্যুশন লিমিটেডের পরিচালক শরীফ আমিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, ‘এটা লিমিটেড কোম্পানি নয়।’
তাহলে প্রকল্পের সকল কাগজপত্রে লিমিটেড লেখা কেন?-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয়ের প্রিন্ট মিসটেক।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























