অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও প্রত্যাবর্তন ইস্যুতে মিয়ানমারের নেতা অং সান সুচি আর সেদেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকায় বাংলাদেশ ক্রমশ ধৈর্য হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কোনোভাবেই স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য মিয়ানমার নিত্য নতুন অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সের প্রতিবেদক জনাথন স্পাইসার এবং রডরিগো ক্যাম্পোস’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইতোমধ্যেই আমার দেশে ১৬ কোটি মানুষ রয়েছে। আমি আর কোনো বোঝা নিতে চাই না। আমি নিতে পারব না। আমার দেশ নিতে পারবে না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমারসবকিছুতেই সম্মতি জানায়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তারা কথা অনুযায়ী কাজ করে না। এটাই হলো মূল সমস্যা।’
যখনই বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ সৃষ্টি করে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রদর্শন করে। এমনকি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ট্রানজিট সেন্টার স্থাপন করেছে বলেও জানিয়েছিল মিয়ানমার। পাশাপাশি মিয়ানমার এমন অভিযোগ করে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের সঠিক ফরম বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারকে সরবরাহ করেনি। বাংলাদেশ এমন অভিযোগ সত্য নয় বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মিয়ানমারের দিক থেকে অমানবিক ও অপেশাদারি আচরণ অব্যাহত থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণ অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদেরকে টেকনাফ ও কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে সরিয়ে ভাসানচর নামক একটি দ্বীপে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে এনেছে বাংলাদেশ সরকার।
উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ভাসানচরের শরণার্থী ক্যাম্প এর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আজীবন থেকে যাবে, এদেরকে ফিরে যেতেই হবে। কারণ এরা বাংলাদেশের নয়, মিয়ানমারের নাগরিক।’
মিয়ানমারের দিক থেকে সময় ক্ষেপণের কৌশল নিয়ে রয়টার্সের সাংবাদিক ফোন করেছিলেন মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্রকে। কিন্তু তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে তাদের কোনো মুখপাত্র এখন থেকে ফোনে কোনো কথা বলবে না। দুই সপ্তাহ পর পর সংবাদ সম্মেলনেই সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন নির্দিষ্ট মুখপাত্ররা।
এই সপ্তাহে মার্কিন সরকার নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত করে বলেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে এবং তাদের বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আয়োজিত রোহিঙ্গা বিষয়ক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তিন দফা প্রস্তাবনা পেশ করেন। শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাব শীর্ষক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগদান করে রোহিঙ্গা সংকট চিরতরে সমাধানের লক্ষ্যে বৈষম্যমূলক আইনের বিলোপ, নীতিমালা এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধসহ তিন দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেজের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনার ‘শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাবের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক : এ মডেল ফর গ্রেটার সলিডারিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্বল্প সময়ের মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে। রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। অথচ তারা সেখানে কয়েকশ’ বছর ধরে বসবাস করে আসছে।
প্রথম সুপারিশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি বিলোপ, এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ ও তাদের সে দেশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
দ্বিতীয় সুপারিশে তিনি বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই সকল রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব প্রদানের সঠিক উপায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রয়োজনে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় মিয়ানমারের ভেতরে ‘সেফ জোন’ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয় সুপারিশে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য রোধে অপরাধীদের জবাবদিহিতা, বিচার, বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের সুপারিশমালার আলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
জাতিসংঘের সে বৈঠকে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছি, যা আমাদের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের জন্য ছয় হাজার একরের বেশি জমি বরাদ্দ দিয়েছি। রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক ও অন্যান্য সম্পদ, সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতি আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিশেষ করে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সাহায্য দিয়ে আসছে
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















