অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার ফুল আর জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনে বিদায় নিলেন মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার কিছুক্ষণ আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রিয়ভাষিণীর মরদেহবাহী কফিন নিয়ে আসেন তার মেয়ে রত্নেশ্বরী প্রিয়দর্শিনী, ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী, ছেলে কারু তিতাস ও কাজী শাকের তূর্য।
এর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়ভাষিণীর মরদেহকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর পর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে সর্বস্তরের মানুষ প্রিয়ভাষিণীর কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন। তাদের শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ঢেকে যায় চির সংগ্রামী এ শিল্পীর কফিন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।
পরে তার কফিন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে বাদ জোহর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
আগামী ১০ মার্চ বিকাল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে।
জানা গেছে, বেলা ১১টায় রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর পর পরই আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রিয়ভাষিণীর কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
প্রখ্যাত ভাস্কর প্রিয়ভাষিণীকে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শ্রদ্ধা জানান। সৈয়দ আশরাফের পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শ্রদ্ধা জানায়।
এ ছাড়া প্রখ্যাত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, সাম্যবাদী দল, স্থপতি ইনস্টিটিউট, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ সময় শহীদ মিনারে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ড. সারওয়ার আলী, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, অভিনেত্রী লায়লা আফরোজসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্টজনরা ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রিয়ভাষিণীর যে ত্যাগ, তা নতুন প্রজন্মের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার শিল্পকর্ম নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, নারী আন্দোলনে প্রিয়ভাষিণী অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন। নান্দনিক শিল্পচর্চায় তিনি অবদান রেখেছেন। স্মৃতিতে সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
হাসানুল হক ইনু বলেন, সাহস থাকলে যে সব বাধা পেরিয়ে জয় করা যায়, তার উদাহরণ ফেরদৌসী। নারীর সমস্যা, অধিকারের বিষয়ে সবসময় তিনি সোচ্চার ছিলেন। নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু রাজাকাররা। উনি পরাজিত করেছেন তাদের। তার ওপর বারবার আঘাত এসেছে, কিন্তু তিনি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি জীবনভর লড়াই করে গেছেন।
প্রিয়ভাষিণীর পরিবারের পক্ষ থেকে কন্যা ফুলেশ্বরী বলেন, সারাজীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন। তার একটি শেষ ঠিকানা দরকার ছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পাশে সেই শেষ ঠিকানা পাওয়ায় গর্বিত লাগছে।
গত মঙ্গলবার দুপুর ১টায় রাজধানীর বেসরকারি ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ইন্তেকাল করেন। তিনি হৃদরোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক পান। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব প্রদান করে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















