ঢাকা ০২:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
হাদি হত্যার কেবল চার আসামি নয়, সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ অচেতন অবস্থায় রংপুরে উদ্ধার গাইবান্ধা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সরকারের উচিত নয়: আমির খসরু আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আনতে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো চাপ নেই: শফিকুল আলম আমরা এখন আর আইসিইউতে নেই, কেবিনে উঠে এসেছি: অর্থ উপদেষ্টা ‘বন্দি থাকাকালে বেগম জিয়ার পক্ষে কথা বলার কেউই ছিলেন না’:আসিফ নজরুল নোয়াখালীকে হারিয়ে টেবিলের শীর্ষে চট্টগ্রাম রয়্যালস খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা জোট নয়, এককভাবেই নির্বাচনে লড়বে ইসলামী আন্দোলন ওসমান হাদির ভাইকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ মিশনে নিয়োগ

যার জনপ্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কাঁটাতারের বেড়া

আকাশ বিনোদন ডেস্ক: 

সবাইকে কাঁদিয়ে ওপারে পাড়ি দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ব্রান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু। তার প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি অঙ্গনে। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন ব্লগার, সঙ্গীতশিল্পী ও ভারতের সংস্কৃতি কর্মী

শবনম সুরিতা। বর্তমানে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণএশীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষক হিসেবে কাজ করছেন শবনম। ডয়চে ভেলে থেকে তার ব্লগটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

চলে গেলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যান্ডশিল্পী ও গিটারবাদক আইয়ুব বাচ্চু৷ ঘুম ভেঙেই প্রিয় সংগীত শিল্পীর মৃত্যুসংবাদ অনেক পুরোনো স্মৃতি উসকে দিলো৷

সালটা ছিল ২০১৩৷ আমরা তখন সবে থার্ড ইয়ারে উঠেছি৷ ডানা গজিয়েছে সদ্য সদ্য৷ পড়াশোনা ফেলে দিন-রাত গলা ছেড়ে গান গাওয়াই তখন আমাদের কাজ৷ এমন সময় আমাদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেস্টে এলো বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যান্ড ‘এলআরবি’৷ ততদিনে ‘এলআরবি’ নামটার সাথে আমাদের রোজকারের ওঠাবসা৷ নতুন প্রেমে ধাক্কা খেলে সারা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একসাথে গেয়ে ওঠে, ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’৷ সবার কল্পনায় প্রেমে পড়লে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে টুটুল ভাইয়ের কী-বোর্ড, সাথে আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী ‘রুপালি গিটার’৷

শুধু শহুরে কলেজ-ক্যাম্পাসে নয়, ভারতীয় বাংলাভাষী মফস্বলের শ্রোতার কাছেও সহজ কথায় বাঁধা তাঁর গানের, বাজনার গ্রহণযোগ্যতা ছিল তারই সমসাময়িক অনেক ভারতীয় শিল্পীর ঈর্ষার কারণ৷ ‘এলআরবি’র কন্ঠ ও গিটারশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কাঁটাতারের বেড়া৷

আসামের ছোট্ট শহর, শিলচরে বেড়ে ওঠার কারণে কলকাতার জনপ্রিয় গান আমাদের কাছে খানিক দেরিতেই এসে পৌঁছত৷ ওপার বাংলার কিছু হাতে গোনা লোকশিল্পী ছাড়া সেভাবে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে বড় হওয়ার সময় কাছে পাইনি৷ পরে কলকাতায় গিয়ে সেই বাধাটুকু আর ছিল না৷ আস্তে আস্তে গানের জগতের সাথে সখ্য আরো গভীর হয়ে উঠলে কাছ থেকে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে অনুভব করার, বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে পরিচয় করার সুযোগ পাই৷

ছাত্রজীবনে স্বচক্ষে দেখেছি কীভাবে আইয়ুব বাচ্চু ‘ভিনদেশী’ শিল্পী হয়েও কত সহজে আপন করে নিতেন এপার বাংলার ব্যান্ডের সদস্যদের৷ তাদের অনেকের কাছেই তিনি তাই বড় শ্রদ্ধার, ভালোবাসার ‘বাচ্চু ভাই’৷

‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে বহুদূরে, সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে’ তাঁর এই গানটি যেন আজ এপিটাফ৷ সেই আইয়ুব বাচ্চু’র মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই শোকস্তব্ধ গোটা বাংলাদেশের সাথে ভারতেরও বাংলা সংগীত জগৎ৷ সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে স্মরণ করছেন পুরোনো থেকে নতুন, সব প্রজন্মের শিল্পীরা৷

জনপ্রিয় ব্যান্ড ফসিলসের শিল্পী রূপম ইসলাম ফেসবুকে দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চুর সাথে তার কাটানো সময়ের একটি ভিডিও৷ দুঃখের সাথে জানিয়েছেন দুজনের সাংগীতিক পরিকল্পনার কথা, যা রয়ে গেলো অপূর্ণই৷

দুই বাংলায় সমানভাবে জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী, সাহানা বাজপেয়ী লিখেছেন, ‘আমাদের দিনগুলি রঙিন করে তোলার জন্য ধন্যবাদ, বাচ্চু ভাই!’ ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গায়িকা ইমন চক্রবর্তীও এই কিংবদন্তি শিল্পীকে তার শ্রদ্ধা জানিয়েছেন৷

এ বছরই কয়েক মাস আগে কলকাতায় এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু৷ শহরের বিখ্যাত পাব ‘সামপ্লেস এল্স’ এ তাঁকে হঠাৎ দেখা যায়৷ এই শহরেরই আরেক তরুণ গিটার বাদক সানি ভট্টাচার্য তখন মঞ্চে৷ মঞ্চে উঠে তার কাঁধে হাত রাখলেন সানির আজীবনের অনুপ্রেরণা আইয়ুব বাচ্চু৷

আজ শোকের এই দিনে সেদিনে ফিরে গিয়ে সানি বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকে যার গান শুনেছি, বাজিয়েছি, সেই মানুষটা সেদিন আমার পাশে৷ অন্য অনুভূতি! আমার আইয়ুব বাচ্চুর সাথে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘সেই তুমি’ বাজানোর স্বপ্ন সেদিন পূরণ হয়েছিল৷’’

আরেক তরুণ কন্ঠশিল্পী তিমির জানালেন, ‘বাচ্চু ভাই আমাদের প্রজন্মকে অসম্ভব স্নেহ করতেন৷ দেশ-কাল-রাষ্ট্রের উপরে থাকা এই মানুষটি চলে যাওয়ায় আমাদের দায়িত্ব কয়েকগুণ বেড়ে গেল৷ তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মানুষ৷’

শিল্পীমহলে ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে খবর৷ অতি প্রিয় ‘বাচ্চু ভাই’ এর স্মৃতিতে কলকাতার বিখ্যাত ম্যাডক্স স্কোয়ারে শীঘ্রই বসতে চলেছে বাংলা গানের আসর৷ চিরবিনয়ী এই মানুষটির চলে যাওয়া আসলে একটি যুগের, প্রতিষ্ঠানের অবসান৷ দেখনদারী ও প্রতিযোগিতায় ঘেরা বর্তমান সংগীত জগতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী উদাহরণ৷ দেশে হোক বা বিদেশে, নতুন শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন অভিভাবক হারালো আজ দুই বাংলার সংগীত জগত৷

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাদি হত্যার কেবল চার আসামি নয়, সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ

যার জনপ্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কাঁটাতারের বেড়া

আপডেট সময় ০২:৫৪:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮

আকাশ বিনোদন ডেস্ক: 

সবাইকে কাঁদিয়ে ওপারে পাড়ি দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ব্রান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু। তার প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি অঙ্গনে। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন ব্লগার, সঙ্গীতশিল্পী ও ভারতের সংস্কৃতি কর্মী

শবনম সুরিতা। বর্তমানে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণএশীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ক গবেষক হিসেবে কাজ করছেন শবনম। ডয়চে ভেলে থেকে তার ব্লগটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

চলে গেলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যান্ডশিল্পী ও গিটারবাদক আইয়ুব বাচ্চু৷ ঘুম ভেঙেই প্রিয় সংগীত শিল্পীর মৃত্যুসংবাদ অনেক পুরোনো স্মৃতি উসকে দিলো৷

সালটা ছিল ২০১৩৷ আমরা তখন সবে থার্ড ইয়ারে উঠেছি৷ ডানা গজিয়েছে সদ্য সদ্য৷ পড়াশোনা ফেলে দিন-রাত গলা ছেড়ে গান গাওয়াই তখন আমাদের কাজ৷ এমন সময় আমাদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেস্টে এলো বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যান্ড ‘এলআরবি’৷ ততদিনে ‘এলআরবি’ নামটার সাথে আমাদের রোজকারের ওঠাবসা৷ নতুন প্রেমে ধাক্কা খেলে সারা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একসাথে গেয়ে ওঠে, ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’৷ সবার কল্পনায় প্রেমে পড়লে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে টুটুল ভাইয়ের কী-বোর্ড, সাথে আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী ‘রুপালি গিটার’৷

শুধু শহুরে কলেজ-ক্যাম্পাসে নয়, ভারতীয় বাংলাভাষী মফস্বলের শ্রোতার কাছেও সহজ কথায় বাঁধা তাঁর গানের, বাজনার গ্রহণযোগ্যতা ছিল তারই সমসাময়িক অনেক ভারতীয় শিল্পীর ঈর্ষার কারণ৷ ‘এলআরবি’র কন্ঠ ও গিটারশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কাঁটাতারের বেড়া৷

আসামের ছোট্ট শহর, শিলচরে বেড়ে ওঠার কারণে কলকাতার জনপ্রিয় গান আমাদের কাছে খানিক দেরিতেই এসে পৌঁছত৷ ওপার বাংলার কিছু হাতে গোনা লোকশিল্পী ছাড়া সেভাবে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে বড় হওয়ার সময় কাছে পাইনি৷ পরে কলকাতায় গিয়ে সেই বাধাটুকু আর ছিল না৷ আস্তে আস্তে গানের জগতের সাথে সখ্য আরো গভীর হয়ে উঠলে কাছ থেকে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে অনুভব করার, বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে পরিচয় করার সুযোগ পাই৷

ছাত্রজীবনে স্বচক্ষে দেখেছি কীভাবে আইয়ুব বাচ্চু ‘ভিনদেশী’ শিল্পী হয়েও কত সহজে আপন করে নিতেন এপার বাংলার ব্যান্ডের সদস্যদের৷ তাদের অনেকের কাছেই তিনি তাই বড় শ্রদ্ধার, ভালোবাসার ‘বাচ্চু ভাই’৷

‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে বহুদূরে, সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে’ তাঁর এই গানটি যেন আজ এপিটাফ৷ সেই আইয়ুব বাচ্চু’র মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই শোকস্তব্ধ গোটা বাংলাদেশের সাথে ভারতেরও বাংলা সংগীত জগৎ৷ সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে স্মরণ করছেন পুরোনো থেকে নতুন, সব প্রজন্মের শিল্পীরা৷

জনপ্রিয় ব্যান্ড ফসিলসের শিল্পী রূপম ইসলাম ফেসবুকে দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চুর সাথে তার কাটানো সময়ের একটি ভিডিও৷ দুঃখের সাথে জানিয়েছেন দুজনের সাংগীতিক পরিকল্পনার কথা, যা রয়ে গেলো অপূর্ণই৷

দুই বাংলায় সমানভাবে জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী, সাহানা বাজপেয়ী লিখেছেন, ‘আমাদের দিনগুলি রঙিন করে তোলার জন্য ধন্যবাদ, বাচ্চু ভাই!’ ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গায়িকা ইমন চক্রবর্তীও এই কিংবদন্তি শিল্পীকে তার শ্রদ্ধা জানিয়েছেন৷

এ বছরই কয়েক মাস আগে কলকাতায় এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু৷ শহরের বিখ্যাত পাব ‘সামপ্লেস এল্স’ এ তাঁকে হঠাৎ দেখা যায়৷ এই শহরেরই আরেক তরুণ গিটার বাদক সানি ভট্টাচার্য তখন মঞ্চে৷ মঞ্চে উঠে তার কাঁধে হাত রাখলেন সানির আজীবনের অনুপ্রেরণা আইয়ুব বাচ্চু৷

আজ শোকের এই দিনে সেদিনে ফিরে গিয়ে সানি বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকে যার গান শুনেছি, বাজিয়েছি, সেই মানুষটা সেদিন আমার পাশে৷ অন্য অনুভূতি! আমার আইয়ুব বাচ্চুর সাথে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘সেই তুমি’ বাজানোর স্বপ্ন সেদিন পূরণ হয়েছিল৷’’

আরেক তরুণ কন্ঠশিল্পী তিমির জানালেন, ‘বাচ্চু ভাই আমাদের প্রজন্মকে অসম্ভব স্নেহ করতেন৷ দেশ-কাল-রাষ্ট্রের উপরে থাকা এই মানুষটি চলে যাওয়ায় আমাদের দায়িত্ব কয়েকগুণ বেড়ে গেল৷ তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মানুষ৷’

শিল্পীমহলে ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে খবর৷ অতি প্রিয় ‘বাচ্চু ভাই’ এর স্মৃতিতে কলকাতার বিখ্যাত ম্যাডক্স স্কোয়ারে শীঘ্রই বসতে চলেছে বাংলা গানের আসর৷ চিরবিনয়ী এই মানুষটির চলে যাওয়া আসলে একটি যুগের, প্রতিষ্ঠানের অবসান৷ দেখনদারী ও প্রতিযোগিতায় ঘেরা বর্তমান সংগীত জগতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী উদাহরণ৷ দেশে হোক বা বিদেশে, নতুন শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন অভিভাবক হারালো আজ দুই বাংলার সংগীত জগত৷