ঢাকা ১০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রকাশ হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল উদ্ধার হলো সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি জাপানি বিনিয়োগের জন্য পাঁচ খাত চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী ড্যাবের বিরুদ্ধে: কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের দেশে হাম ও উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্র করছে গুপ্তরা: ডিএনসিসি প্রশাসক ডেঙ্গুতে একদিনে ১১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত দুই হাজার ছাড়াল ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের উদ্বেগ রূপপুরের জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল রাশিয়ার কার্গো বিমান

মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা: অস্বীকার ও দোষারোপের ঊর্ধ্বে সমাধান

কওমি মাদ্রাসার আঙিনা থেকে বেরিয়ে আসা বহু মানুষ আজ সমাজের মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন।

এই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের সমাজকাঠামোর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু সুরক্ষা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে, তা উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এই চিরায়ত দৃশ্যটা মাথায় রেখেই সাম্প্রতিক খবরগুলোর দিকে তাকাই। মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কোথায় জানাতে হবে।

সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে শিক্ষকসহ মাদ্রাসার ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষককে আসামি করা হয়েছে।

প্রায় একই সময়ে সিলেট নগরীর একটি মাদ্রাসায় ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আরবি বিভাগের এক শিক্ষক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শিশুকে যে ভরসা দেওয়ার কথা, সে আস্থার জায়গায় নেমে আসে অন্ধ শাসন।

এছাড়া আগস্ট মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের এক শিশুকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষককে র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছে।

যদিও এসব ঘটনা এখনো অভিযোগের পর্যায়ে এবং আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ, কিন্তু ভুক্তভোগী শিশুদের কান্না এবং তাদের অসহায় আর্তনাদ নিরেট বাস্তবতা। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের দায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা সামাজিক অবিশ্বাসের অস্ত্রে পরিণত করা ন্যায়সংগত নয়। বরং দায়ী ব্যক্তির কঠোর বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনের নীতি অনুযায়ী, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শিক্ষাব্যবস্থা আর আমাদের সমাজকাঠামো আলাদা কিছু নয়। বিত্তবান বা মধ্যবিত্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয় এখনো।

কওমি মাদ্রাসার বিস্তৃতি অনেক বিশাল। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বেফাকুল মাদারিসের প্রধান পরিচালক উবায়দুর রহমান খান নদভির মতে, শুধু তাদের অধীনেই ৩২ হাজারের বেশি মাদ্রাসা নিবন্ধিত আছে। বাকি পাঁচটি বোর্ড মিলে দেশে মোট ৫০ হাজারের বেশি মাদ্রাসা রয়েছে এবং সেখানে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। কওমি মাদ্রাসাকে ‘ওরা’ বলে আলাদা করে ফেলার আগে সংখ্যাগুলো দেখা দরকার। ফলে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন বলে অনেকে মন্তব্য করে থাকেন।

এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকের সন্তান। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু স্বীকৃতির পাশাপাশি জবাবদিহির কাঠামো কতটা শক্তিশালী হয়েছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, সালিস করে মীমাংসা বা শিক্ষককে চুপচাপ বদলি করার মতো ঘটনা ঘটে। এটি অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে, কারণ অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা আবারও একই কাজ করার সুযোগ পায়। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে। এখানে এসে প্রশংসার সুর ছেড়ে কিছু কঠিন কথায় যেতে হবে, কারণ সেটাই সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীর কাজ।

শিক্ষাদানের নামে শারীরিক সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। যখন কোনো শিক্ষক ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হন, তখন শিশুর জন্য প্রতিকার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধকে সামগ্রিক ধারার চরিত্র হিসেবে বিচার করা ভুল। অন্যান্য পেশার মানুষের অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে পুরো খাতকে দোষারোপ করি না, এক্ষেত্রেও একই যৌক্তিকতা থাকা প্রয়োজন। তবে এই পার্থক্য দেখানো যেন কওমি বোর্ডগুলোর জন্য দায় এড়ানোর উপায় না হয়। ভোরে গ্রামের মক্তবে দল বেঁধে পড়তে যাওয়া, সহজ-সরল হুজুরের কাছে আলিফ-বা-তা শেখা কিংবা রমজানে তারাবিতে কোনো কিশোর হাফেজের সুললিত কোরআন তিলাওয়াত শোনা—এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষক যিনিই হোন, যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন, শিশুর ওপর নিপীড়নের একটাই নাম—জঘন্য অপরাধ। এখন এই হিসাবও অনুমাননির্ভর, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তাঁদের কাছে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই। লাখো শিশুর আবাসন, খাওয়া, বইপত্র—প্রায় সবই চলে সমাজের মানুষের দানে। কোরবানির চামড়ার টাকা, রমজানে জাকাত, ধান কাটার মৌসুমে মুষ্টির চাল—এই চক্রই বহু প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। গ্রামের জানাজা, নিকাহ, দোয়া-মাহফিল থেকে শুরু করে সমাজের ধর্মীয় জীবনের বড় অংশ চলে এই ধারার মানুষদের হাত ধরে। সে কারণেই এই ধারাকে সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো ইতিহাস ও বাস্তবতা—দুটোর সঙ্গেই অসংগত। সেই আইনের পথ ধরেই কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনর্গঠিত হয়েছে। অস্বস্তিকর প্রশ্নটা কওমি ধারাকেই করতে হবে। যেসব প্রতিবেদন আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়েছি, তাতে বারবার একটি ভয়াবহ প্যাটার্ন দেখা যায়: ভয়ভীতি দেখানো, ‘বিশেষ পড়া’ বা সেবার অজুহাতে ডেকে নেওয়া, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

অতীতে জঙ্গিবাদের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে আলেম-সমাজ যেভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার কাতারে থেকেছে, তা প্রশংসনীয়। সুতরাং, অপরাধীকে চিহ্নিত করা আর একটি পুরো শিক্ষাধারাকে সন্দেহের চোখে দেখা এক বিষয় নয়। শিশু নির্যাতনকারীর বিচার চাওয়ার জন্য কাউকে কওমিবিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সমাধানের পথে এগোতে হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের জন্য লিখিত সুরক্ষা নীতিমালা থাকতে হবে। একটি স্বাধীন হটলাইন চালু করা, শিক্ষক নিয়োগে কঠোর পটভূমি যাচাই করা এবং অভিভাবকদের নিয়মিত মাদ্রাসায় পরিদর্শনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন যে, ঘটনা ঢাকলে সম্মান বাঁচে না, বরং অপরাধীর বিচার হলেই প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পায়। এই সমাজই তাদের শোধরানোর জায়গা, তাই পারস্পরিক মমতায় আমাদের এই শিশুদের আগামী দিনের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে। এর বিচার হতে হবে দ্রুত, দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য। প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশিও হতে পারে। রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থায় কি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর পৃথক জায়গা নিশ্চিত করা হয়।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জে ১১ কোটি টাকায় ফোর লেন সড়ক নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে

মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা: অস্বীকার ও দোষারোপের ঊর্ধ্বে সমাধান

আপডেট সময় ০৮:০৮:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

কওমি মাদ্রাসার আঙিনা থেকে বেরিয়ে আসা বহু মানুষ আজ সমাজের মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন।

এই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের সমাজকাঠামোর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু সুরক্ষা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে, তা উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। এই চিরায়ত দৃশ্যটা মাথায় রেখেই সাম্প্রতিক খবরগুলোর দিকে তাকাই। মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কোথায় জানাতে হবে।

সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে শিক্ষকসহ মাদ্রাসার ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষককে আসামি করা হয়েছে।

প্রায় একই সময়ে সিলেট নগরীর একটি মাদ্রাসায় ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আরবি বিভাগের এক শিক্ষক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শিশুকে যে ভরসা দেওয়ার কথা, সে আস্থার জায়গায় নেমে আসে অন্ধ শাসন।

এছাড়া আগস্ট মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের এক শিশুকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষককে র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছে।

যদিও এসব ঘটনা এখনো অভিযোগের পর্যায়ে এবং আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ, কিন্তু ভুক্তভোগী শিশুদের কান্না এবং তাদের অসহায় আর্তনাদ নিরেট বাস্তবতা। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের দায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা সামাজিক অবিশ্বাসের অস্ত্রে পরিণত করা ন্যায়সংগত নয়। বরং দায়ী ব্যক্তির কঠোর বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনের নীতি অনুযায়ী, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শিক্ষাব্যবস্থা আর আমাদের সমাজকাঠামো আলাদা কিছু নয়। বিত্তবান বা মধ্যবিত্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয় এখনো।

কওমি মাদ্রাসার বিস্তৃতি অনেক বিশাল। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বেফাকুল মাদারিসের প্রধান পরিচালক উবায়দুর রহমান খান নদভির মতে, শুধু তাদের অধীনেই ৩২ হাজারের বেশি মাদ্রাসা নিবন্ধিত আছে। বাকি পাঁচটি বোর্ড মিলে দেশে মোট ৫০ হাজারের বেশি মাদ্রাসা রয়েছে এবং সেখানে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। কওমি মাদ্রাসাকে ‘ওরা’ বলে আলাদা করে ফেলার আগে সংখ্যাগুলো দেখা দরকার। ফলে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন বলে অনেকে মন্তব্য করে থাকেন।

এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকের সন্তান। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু স্বীকৃতির পাশাপাশি জবাবদিহির কাঠামো কতটা শক্তিশালী হয়েছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, সালিস করে মীমাংসা বা শিক্ষককে চুপচাপ বদলি করার মতো ঘটনা ঘটে। এটি অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে, কারণ অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা আবারও একই কাজ করার সুযোগ পায়। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে। এখানে এসে প্রশংসার সুর ছেড়ে কিছু কঠিন কথায় যেতে হবে, কারণ সেটাই সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীর কাজ।

শিক্ষাদানের নামে শারীরিক সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। যখন কোনো শিক্ষক ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হন, তখন শিশুর জন্য প্রতিকার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধকে সামগ্রিক ধারার চরিত্র হিসেবে বিচার করা ভুল। অন্যান্য পেশার মানুষের অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে পুরো খাতকে দোষারোপ করি না, এক্ষেত্রেও একই যৌক্তিকতা থাকা প্রয়োজন। তবে এই পার্থক্য দেখানো যেন কওমি বোর্ডগুলোর জন্য দায় এড়ানোর উপায় না হয়। ভোরে গ্রামের মক্তবে দল বেঁধে পড়তে যাওয়া, সহজ-সরল হুজুরের কাছে আলিফ-বা-তা শেখা কিংবা রমজানে তারাবিতে কোনো কিশোর হাফেজের সুললিত কোরআন তিলাওয়াত শোনা—এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষক যিনিই হোন, যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন, শিশুর ওপর নিপীড়নের একটাই নাম—জঘন্য অপরাধ। এখন এই হিসাবও অনুমাননির্ভর, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তাঁদের কাছে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই। লাখো শিশুর আবাসন, খাওয়া, বইপত্র—প্রায় সবই চলে সমাজের মানুষের দানে। কোরবানির চামড়ার টাকা, রমজানে জাকাত, ধান কাটার মৌসুমে মুষ্টির চাল—এই চক্রই বহু প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। গ্রামের জানাজা, নিকাহ, দোয়া-মাহফিল থেকে শুরু করে সমাজের ধর্মীয় জীবনের বড় অংশ চলে এই ধারার মানুষদের হাত ধরে। সে কারণেই এই ধারাকে সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো ইতিহাস ও বাস্তবতা—দুটোর সঙ্গেই অসংগত। সেই আইনের পথ ধরেই কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনর্গঠিত হয়েছে। অস্বস্তিকর প্রশ্নটা কওমি ধারাকেই করতে হবে। যেসব প্রতিবেদন আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়েছি, তাতে বারবার একটি ভয়াবহ প্যাটার্ন দেখা যায়: ভয়ভীতি দেখানো, ‘বিশেষ পড়া’ বা সেবার অজুহাতে ডেকে নেওয়া, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

অতীতে জঙ্গিবাদের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে আলেম-সমাজ যেভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার কাতারে থেকেছে, তা প্রশংসনীয়। সুতরাং, অপরাধীকে চিহ্নিত করা আর একটি পুরো শিক্ষাধারাকে সন্দেহের চোখে দেখা এক বিষয় নয়। শিশু নির্যাতনকারীর বিচার চাওয়ার জন্য কাউকে কওমিবিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সমাধানের পথে এগোতে হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের জন্য লিখিত সুরক্ষা নীতিমালা থাকতে হবে। একটি স্বাধীন হটলাইন চালু করা, শিক্ষক নিয়োগে কঠোর পটভূমি যাচাই করা এবং অভিভাবকদের নিয়মিত মাদ্রাসায় পরিদর্শনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন যে, ঘটনা ঢাকলে সম্মান বাঁচে না, বরং অপরাধীর বিচার হলেই প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পায়। এই সমাজই তাদের শোধরানোর জায়গা, তাই পারস্পরিক মমতায় আমাদের এই শিশুদের আগামী দিনের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে। এর বিচার হতে হবে দ্রুত, দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য। প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশিও হতে পারে। রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থায় কি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর পৃথক জায়গা নিশ্চিত করা হয়।