মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। হোয়াইট হাউসের কলোনেডে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের প্রতিকৃতি দেখানোর সময় ট্রাম্প মজা করে বলেন, ট্রাম্পের ছবির পর পরবর্তীটিতে অটোমেটিক সিগনিং ডিভাইস বসানো হয়েছে। এটি দিয়ে তিনি মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এছাড়া ওয়েস্ট উইংয়ের দেয়ালে থাকা পুরনো একটি বৈঠকের ছবি দেখিয়ে ট্রাম্প সির কাছে জানতে চান, ‘উনি কে? আমি তাঁকে চিনতে পারছি না!’ এমন রসিকতার মাধ্যমে তিনি বন্ধুত্বের আমেজ তৈরির চেষ্টা করেছেন। পরে বলেন, ‘আপনার প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে।’। সির সঙ্গে ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে, জানালেন ট্রাম্প।
দুই নেতার এই রসায়ন প্রদর্শনের প্রচেষ্টা বেশ স্পষ্ট। সফরকালে ট্রাম্প বারবার সির বাহুতে হাত রেখে নিজের ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করেছেন। এর আগে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে নিজে সিকে স্বাগত জানান। কোনো চীনা নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে বর্তমান কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সশরীরে বিমানবন্দরে হাজির হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। মজার বিষয় হলো, গত মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় প্রেসিডেন্ট সি তাঁকে এমন সৌজন্য দেখাননি। প্রশ্ন হলো, চীনের প্রেসিডেন্টও কি একইভাবে ভাবছেন। ট্রাম্পের এক সহযোগীর পোস্ট করা ভিডিও অনুযায়ী, সি হাসলে বিষয়টি জোর দিয়ে বোঝাতে তাঁর বাহুতে হাত রাখেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এই বন্ধুত্বের আগ্রহের পরিধি ছিল বেশ বিস্তৃত। তিনি সিকে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনের নতুন হেলিপ্যাড দেখিয়েছেন এবং বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল আকাশযান ‘মেরিন ওয়ান’ হেলিকপ্টারের ভেতরেও নিয়ে যান। ওভাল অফিসে বসে তিনি চীনা সাংবাদিকদের বিশ্বের ‘সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সংবাদকর্মী’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন, যদিও এর কয়েক দিন আগেই তিনি তিনটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করেছিলেন। এমনকি পাথরের প্রতি সির আগ্রহের বিষয়টি উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রানাইট পাথরের বিশেষজ্ঞ এবং এই বিষয়টিও তিনি পছন্দ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আচরণে সি কখনো সাড়া দিলেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বেশ ভিন্ন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ রায়ান হাস এক্সে লিখেছেন, সি সব সময় রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও ক্ষমতার ভাষায় কথা বলেন, অন্যদিকে ট্রাম্প গুরুত্ব দেন ব্যক্তিগত রসায়নের ওপর। ট্রাম্প যখন বন্ধুত্বের জয়গান গাইছিলেন, সি তখন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য দুই দেশের দায়িত্বের ওপর জোর দেন। এ সময় তিনি তাইওয়ান, ইরান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেইজিংয়ের রেডলাইন বা শেষসীমার কথাও স্পষ্টভাবে জানান। ট্রাম্পের এসব আচরণে কখনো কখনো সিকেও সাড়া দিতে দেখা যায়।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জুডিথ শ্যাপিরো এএফপির সঙ্গে আলাপকালে জানান, বেইজিংয়ের কাছে হোয়াইট হাউসে এমন রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ পাওয়াটা ছিল ন্যূনতম প্রত্যাশা। চীনের কাছে এই সফরটি আবার নিজেদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও সম্মান পুনরুদ্ধারের একটি প্রতীক। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের আর দুই বছরের কিছু বেশি সময় বাকি থাকায় সি চিন পিং হয়তো অত্যন্ত কৌশলী সময় পার করছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে চীনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের এই রূপান্তর লক্ষণীয়। সেই সময় বাণিজ্য এবং করোনা মহামারি নিয়ে তিনি নিয়মিত ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। তবে এবার দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে তিনি কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের জাল বুনতে বেশি আগ্রহী দেখাচ্ছেন।
দিনশেষে ট্রাম্পের এমন আগ্রহের মাঝেও সি চিন পিং আনুষ্ঠানিক আয়োজনে অনেকটা নির্বিকার থেকেছেন। যদিও ট্রাম্পের রসিকতায় মাঝেমধ্যে তিনি মৃদু হেসেছেন, তবে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সংযত ও পরিমাপক। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের এই রসায়ন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শীতল সম্পর্কের বরফ গলাতে পারে কি না। দিনের বেশির ভাগ আনুষ্ঠানিক আয়োজনে নির্বিকার মুখে থাকা সি এ সময় ক্ষণিকের জন্য হেসে ওঠেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















