ঢাকা ১১:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রকাশ হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল উদ্ধার হলো সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি জাপানি বিনিয়োগের জন্য পাঁচ খাত চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী ড্যাবের বিরুদ্ধে: কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের দেশে হাম ও উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্র করছে গুপ্তরা: ডিএনসিসি প্রশাসক ডেঙ্গুতে একদিনে ১১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত দুই হাজার ছাড়াল ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের উদ্বেগ রূপপুরের জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল রাশিয়ার কার্গো বিমান

‘যমুনার রঙ্গলীলা দেখতে দেখতেই কাটলো জীবন’

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

‘নিজেগোরে বাড়িঘর-জমাজমি যা আচিল ৩০ বছর আগেই তা যমুনার প্যাটে গ্যাছে। তারপর সরকারি ওয়াপদায় উঠলাম, হেডোও খাইয়া নিলো রাক্ষুসী যমুনা। আবার মাইনস্যের জমি ভাড়া নিয়া বাড়ি কইর‌্যা থাকা শুরু করচি-বছর বছর তাও ভাইঙ্গা যমুনার মধ্যে চইল্যা যায়। এ বছর একজনের জমি তো পরের বছরই আরেকজনের জমি ভাড়া নিয়্যা থাইকতে অয়।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচ ঠাকুরী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে আশ্রয় খুঁজে পাওয়া ৭০ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ একাধারেই কথাগুলো বলছিলেন। তার সঙ্গে সায় দিতে এগিয়ে এলেন আফসার শেখ, আব্দুর রশিদ, ফরিদা খাতুন, আয়নাল শেখ, আব্দুর রাজ্জাক লতিফা বেগম, বুলবুলি বেওয়াসহ ১৫-২০ জন প্রবীণ ব্যক্তি।

এ সময় কান্না মিশ্রিত হাসিতে বৃদ্ধ আব্দুল খালেক বলে উঠলেন, ‘যমুনার রঙ্গলীলা দেখতে দেখতেই আমাগোরে জীবনটা কাইট্যা গেল। ৩০ বছর আগে বাপ-দাদার ভিটামাটি হারাইচি। ভাড়া নিয়্যা অন্যের ক্ষ্যাতে আশ্রয় নিচি-তাও ভাইঙ্গা গেছে। এইভ্যাবে ১০-১২ বার বাড়িঘর সরাইতে অইচে।’

পাঁচ ঠাকুরী এলাকায় সরেজমিনে গেলে ভাঙন ও বন্যা কবলিত মানুষেরা নিজেদের অভিযোগ ও দুঃখের বর্ণনা দিতে থাকেন।

সিমলা গ্রামে ৯ বিঘা আবাদি জমিসহ সুন্দর বাড়ি ছিল বৃদ্ধ সোবহান আলীর। এখন তার কিছুই নেই। এতদিন ওয়াপদার জায়গায় থেকেছেন। নদীভাঙনে সেই বাড়িটিও সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

বাড়ি সরিয়ে নিতে হচ্ছে জলিল বেপারীকেও। বর্তমানে মাঝ যমুনায় অবস্থান করা খারুয়া গ্রামে বাড়িঘর ও আবাদি জমি ছিল তার। ২৫ বছর আগেই সেগুলো নদীগর্ভে গেছে। তারপর কখনো ওয়াপদা বাঁধ আবার কখনো ভাড়ার জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সর্বশেষ পাঁচ ঠাকুরী ওয়াপদার নিচের ভাড়ার জমিটিও গিলে খেতে বসেছে যমুনা। এ কারণেই বাড়ি সরাতে হচ্ছে তাকে।

হামিদ, রাজ্জাক, ফরিদা, লতিফা বেগদের বাড়িও সিমলা গ্রামেই ছিল, আয়নাল শেখ ও আবু তাহেররা থাকতেন মটিয়ারপুরে। সিমলা, মটিয়ারপুর ও খারুয়া-অস্তিত্বহীন এই তিনটি গ্রামের অবস্থান এখন যমুনা নদীর মাঝে। এসব গ্রামের সর্বস্বহারা মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে কখনো ওয়াপাদা বাঁধ আবার কখনো ভাড়া করা জমিতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করে আসছেন। নিন্ম আয়ের শ্রমজীবী এই মানুষগুলোর জীবন কাটলো যমুনার রক্তচক্ষু দেখতে দেখতেই। বছরের ছয়মাস ভাল থাকলেও বাকি ছয় মাস কাটে যমুনা নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে। জীবনের স্বাদ বলতে যা কিছু বুঝতেই পারেননি তারা।

চলতি বছর জুন মাসে প্রথম দফায় যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। প্রথম দফাতেই পানিবন্দি হয়ে পড়ে এ অঞ্চলের মানুষ। এরপর যমুনার পানি নামতে থাকে। এদিকে সিমলা স্পার বাঁধ ধসের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ ঠাকুরী এলাকার ৬০টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়। জুলাইয়ের প্রথম থেকে আবারও বাড়তে শুরু করে পানি। আবারও পানিবন্দি হয়ে পড়েন তীরবর্তী মানুষগুলো। বাধ্য হয়ে বাঁধের উপর কুড়ে ঘর তুলে আশ্রয় নিচ্ছেন এসব মানুষ।

কথা বলে জানা যায়, দিনমজুর শ্রেণির এই পরিবারগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। বর্তমানে ঘরে পালিত হাঁস-মুরগিসহ গবাদি পশু বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে জানান কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো। বন্যাকালীন সময়টি কিভাবে কাটবে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।

ছোনগাছা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদুল আলম বলেন, চলতি বন্যায় এ ইউনিয়নের গ্রামগুলোর ২৭শ’ পরিবারের ১৩ হাজার ৭০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সিমলা স্পার ধসে যাওয়া আশপাশের ৬০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ও বন্যা কবলিত এলাকার প্রায় ৭০০ পরিবার বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে। এরা সবাই যমুনায় বিলীন হওয়া সিমলা, খারুয়া, বালিঘুগরী, পার পাচিল ও ভাটপিয়ারী গ্রামের মানুষ। ইতোমধ্যে এসব মানুষের তালিকা তৈরি করে উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। ত্রাণ সহায়তা পেলে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘যমুনার রঙ্গলীলা দেখতে দেখতেই কাটলো জীবন’

আপডেট সময় ০৬:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

‘নিজেগোরে বাড়িঘর-জমাজমি যা আচিল ৩০ বছর আগেই তা যমুনার প্যাটে গ্যাছে। তারপর সরকারি ওয়াপদায় উঠলাম, হেডোও খাইয়া নিলো রাক্ষুসী যমুনা। আবার মাইনস্যের জমি ভাড়া নিয়া বাড়ি কইর‌্যা থাকা শুরু করচি-বছর বছর তাও ভাইঙ্গা যমুনার মধ্যে চইল্যা যায়। এ বছর একজনের জমি তো পরের বছরই আরেকজনের জমি ভাড়া নিয়্যা থাইকতে অয়।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচ ঠাকুরী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে আশ্রয় খুঁজে পাওয়া ৭০ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ একাধারেই কথাগুলো বলছিলেন। তার সঙ্গে সায় দিতে এগিয়ে এলেন আফসার শেখ, আব্দুর রশিদ, ফরিদা খাতুন, আয়নাল শেখ, আব্দুর রাজ্জাক লতিফা বেগম, বুলবুলি বেওয়াসহ ১৫-২০ জন প্রবীণ ব্যক্তি।

এ সময় কান্না মিশ্রিত হাসিতে বৃদ্ধ আব্দুল খালেক বলে উঠলেন, ‘যমুনার রঙ্গলীলা দেখতে দেখতেই আমাগোরে জীবনটা কাইট্যা গেল। ৩০ বছর আগে বাপ-দাদার ভিটামাটি হারাইচি। ভাড়া নিয়্যা অন্যের ক্ষ্যাতে আশ্রয় নিচি-তাও ভাইঙ্গা গেছে। এইভ্যাবে ১০-১২ বার বাড়িঘর সরাইতে অইচে।’

পাঁচ ঠাকুরী এলাকায় সরেজমিনে গেলে ভাঙন ও বন্যা কবলিত মানুষেরা নিজেদের অভিযোগ ও দুঃখের বর্ণনা দিতে থাকেন।

সিমলা গ্রামে ৯ বিঘা আবাদি জমিসহ সুন্দর বাড়ি ছিল বৃদ্ধ সোবহান আলীর। এখন তার কিছুই নেই। এতদিন ওয়াপদার জায়গায় থেকেছেন। নদীভাঙনে সেই বাড়িটিও সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

বাড়ি সরিয়ে নিতে হচ্ছে জলিল বেপারীকেও। বর্তমানে মাঝ যমুনায় অবস্থান করা খারুয়া গ্রামে বাড়িঘর ও আবাদি জমি ছিল তার। ২৫ বছর আগেই সেগুলো নদীগর্ভে গেছে। তারপর কখনো ওয়াপদা বাঁধ আবার কখনো ভাড়ার জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সর্বশেষ পাঁচ ঠাকুরী ওয়াপদার নিচের ভাড়ার জমিটিও গিলে খেতে বসেছে যমুনা। এ কারণেই বাড়ি সরাতে হচ্ছে তাকে।

হামিদ, রাজ্জাক, ফরিদা, লতিফা বেগদের বাড়িও সিমলা গ্রামেই ছিল, আয়নাল শেখ ও আবু তাহেররা থাকতেন মটিয়ারপুরে। সিমলা, মটিয়ারপুর ও খারুয়া-অস্তিত্বহীন এই তিনটি গ্রামের অবস্থান এখন যমুনা নদীর মাঝে। এসব গ্রামের সর্বস্বহারা মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে কখনো ওয়াপাদা বাঁধ আবার কখনো ভাড়া করা জমিতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করে আসছেন। নিন্ম আয়ের শ্রমজীবী এই মানুষগুলোর জীবন কাটলো যমুনার রক্তচক্ষু দেখতে দেখতেই। বছরের ছয়মাস ভাল থাকলেও বাকি ছয় মাস কাটে যমুনা নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে। জীবনের স্বাদ বলতে যা কিছু বুঝতেই পারেননি তারা।

চলতি বছর জুন মাসে প্রথম দফায় যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। প্রথম দফাতেই পানিবন্দি হয়ে পড়ে এ অঞ্চলের মানুষ। এরপর যমুনার পানি নামতে থাকে। এদিকে সিমলা স্পার বাঁধ ধসের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ ঠাকুরী এলাকার ৬০টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়। জুলাইয়ের প্রথম থেকে আবারও বাড়তে শুরু করে পানি। আবারও পানিবন্দি হয়ে পড়েন তীরবর্তী মানুষগুলো। বাধ্য হয়ে বাঁধের উপর কুড়ে ঘর তুলে আশ্রয় নিচ্ছেন এসব মানুষ।

কথা বলে জানা যায়, দিনমজুর শ্রেণির এই পরিবারগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। বর্তমানে ঘরে পালিত হাঁস-মুরগিসহ গবাদি পশু বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে জানান কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলো। বন্যাকালীন সময়টি কিভাবে কাটবে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।

ছোনগাছা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদুল আলম বলেন, চলতি বন্যায় এ ইউনিয়নের গ্রামগুলোর ২৭শ’ পরিবারের ১৩ হাজার ৭০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সিমলা স্পার ধসে যাওয়া আশপাশের ৬০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ও বন্যা কবলিত এলাকার প্রায় ৭০০ পরিবার বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে। এরা সবাই যমুনায় বিলীন হওয়া সিমলা, খারুয়া, বালিঘুগরী, পার পাচিল ও ভাটপিয়ারী গ্রামের মানুষ। ইতোমধ্যে এসব মানুষের তালিকা তৈরি করে উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। ত্রাণ সহায়তা পেলে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।