আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত তাণ্ডব শুরু করেনি করোনাভাইরাস। কিন্তু এর মধ্যেই সরকার অনেকগুলো বিধিনিষেধ শিথিল করেছে, সামাজিক দুরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলকারখানা চালু করে দেয়া হয়েছে, সরকারই অফিস আংশিক চালু হয়েছে, বাজারহাট খোলা আছে এবং দোকানপাটও খুলে দেয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, অনেকে মনে করছেন বাংলাদেশ এটা করে করোনার ব্যাপক সংক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দিল।
কিন্তু এই সমস্ত সমালোচনা সত্ত্বেও ‘ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকা বলছে যে, বিশ্বে করোনা পরবর্তী সময়ে যে ৬৬ টি দেশ অর্থনীতিতে ভালো করবে, তাঁর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সম্প্রতি ‘ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকা যে উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলোর তালিকা তৈরি করেছে, যে দেশগুলো করোনা পরবর্তী সময়ে দ্রুত এগিয়ে যাবে তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ আছে ৯ নম্বরে। এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ করোনা মোকাবেলাকে দ্বিতীয় স্থানে জায়গা দিয়েছে এবং সবথেকে অগ্রাধিকার দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠাকে। করোনার সময়ে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্যের হুমকি তৈরি হয়, মানুষ মারা যায় এবং নানারকম স্বাস্থ্য হানির ঘটনা ঘটে।
ঠিক তেমনিভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কট বেশি হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জী বলেছেন যে, করোনা পররবর্তী যে অর্থনৈতিক সঙ্কট, সেই সঙ্কট করোনার থেকেও ভয়াবহ। আর এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ করোনা সঙ্কট মোকাবেলাকে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে প্রথম অগ্রাধিকার দিচ্ছে মন্দা মোকাবেলাকে এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠাকে। আর একারণেই বাংলাদেশ পোশাক শিল্প খুলে দিয়েছে এবং কলকারখানা খুলে অর্থনৈতিক গতিকে সচল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর এর ফল যে ইতিবাচক হবে তারই পূর্বাভাস দিয়েছে ‘ইকোনোমিস্ট’।
যদিও করোনার শুরুতে বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ বলেছিল যে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির বড় ধরণের পতন ঘটবে এবং এটা ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কিন্তু সংশোধিত প্রক্ষেপণে বলা হচ্ছে যে, করোনার মাঝেও বাংলাদেশ সাড়ে পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। মন্দা মোকাবেলায় বাংলাদেশ নি:সন্দেহে ইতিমধ্যে ভালো প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন যে, যদি বাংলাদেশে দূর্নীতি না হয়, সুশাসন নিশ্চিত হয়- তাহলে করোনা মোকাবেলায় যে পদক্ষেপগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছে তাঁর সুফল বাংলাদেশ ভোগ করবে। দেখা যাক কোন কোন ক্ষেত্রে মন্দা মোকাবেলায় বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে-
১. খাদ্য নিরাপত্তা
বাংলাদেশ করোনার সংক্রমণের শুরু থেকেই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন এবং গরীব মানুষজন যেন খাবার পায় তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ের নিম্নবিত্ত মানুষদের যেমন বিনামূল্যে খাবার নিশ্চিতের যেমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বল্প মূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ারও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও এর সুফল একদম চুইয়ে পড়া মানুষরা ভোগ করছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশের জন্য সুখবর হলো এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এই ধান কাটার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বোরো ধানের প্রায় ৯৫ ভাগ কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি বড় ধরণের সুযোগ করে দিবে।
২. পোশাক খাতে নতুন বাজার
করোনার কারণে বিশ্ব পোশাক বাজারে নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। এখন চীন এবং ভারতের পোশাক খাতে প্রায় ধ্বস নেমেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ঝুঁকি নিয়েও পোশাক কারখানাগুলো চালু করেছে। এটা ব্যাপক সমালোচিত হলেও পোশাকের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতামূলক বাজারে ইতিবাচক হিসেবেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ পোশাক খাতের নেতৃত্ব দিবে এবং বাংলাদেশে যেহেতু পোশাক কারখানাগুলো চালু রয়েছে, তাই বিশ্বের সব অর্ডারগুলো বেশি বেশি করে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশ্বে প্রথম স্থানও দখল করে নিতে পারে বলে মনে করছেন কোন কোন অর্থনীতিবিদ।
৩. বিশ্বে রপ্তানি বাড়বে
শুধু পোশাক খাত নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের রপ্তানির সুযোগ তৈরি করবে করোনাভাইরাস। কারণ এর ফলে অর্থনীতিতে যে টালমাটাল অবস্থা থাকবে, তাতে অনেক দেশই তাঁদের নিজস্ব কলকারখানায় উৎপাদনের চেয়ে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে এবং কম মূল্যে যে সমস্ত জিনিস তৈরি হয়, সে সমস্ত জিনিসপত্রের দিকে ঝুঁকবে। ফলে বাংলাদেশে ওষুধ, চামড়াশিল্প সহ নানা রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বাড়বে এবং দেশের রপ্তানি বাজার বড় হবে।
৪. দেশীয় বাজার শক্তিশালী হবে
করোনার পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের একটি বড় চাহিদা তৈরি হবে। কারণ যেহেতু সরকারের অর্থনৈতিক প্রণোদনাগুলো প্রায় সবস্তরের মানুষের মাঝে পড়েছে, এই প্রণোদনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প কারখানাগুলো বাংলাদেশের বাজারে ব্যাপকভাবে চাহিদা তৈরি করবে। সেক্ষেত্রে যদি আংশিকভাবে সফল হলেও বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বাজার তৈরি হবে। যেটা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং মজবুত করবে।
৫. নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে
করোনা সঙ্কটের কালে অনেকে চাকরি হারাবে, অনেকে বেকার হবে। এইসময় মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবনী এবং উদ্যমী শক্তিতে তাঁরা নিজেরাই উদ্যোক্তা হওবার চেষ্টা করবেন এবং করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
আর এইসমস্ত কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে করোনা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে এসেছে এবং অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন যে বাংলাদেশে মন্দা হবেনা, বরং করোনা পরবর্তী বিশ্বে বাংলাদেশ আরো শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























