আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই কুলসুম বেগমের। পবিত্র মাহে রমজানের ১১তম রোজা চলছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ইফতার। ঈশ্বরদীর অনেক ঘরেই চলছে ইফতারের বাহারি আয়োজন। সেই মুহূর্তে রোজা রেখে চুলোর পাশে ভাত রান্না করছেন কুলসুম বেগম। চুলোর পাশে একটি কাঁচা বেগুন পড়ে আছে। বেগুন কী হবে জানতে চাইলে মুচকি হেসে বলেন, ওজা (রোজা) থাকি। সেহরির হুময় হুকনো ভাত বেগুন ভর্তা ভালোই লাগে। আর না হলে দুগা শুকনো ভাত খেয়েই ওজা (রোজা) রাখি।
মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে তার বাড়িতে গেলে এ চিত্র চোখে পড়ে। তিনি পাবনার ঈশ্বরদীর পৌর এলাকার পিয়ারাখালী মহল্লার দুই নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। যিনি গ্রামে কুতুব আলীর মা নামে পরিচিত।
বৃদ্ধা কুলসুম বেগমের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন যে ভাত রান্না করছেন, তা দিয়েই হবে সন্ধ্যায় ইফতার। সেখান থেকে কিছু ভাত রেখে দেবেন তা দিয়েই হবে সেহরি।
কুলসুম বেগমের ছোট ছেলে তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকেন উচ্চবিলাসে। মেয়েরা থাকলেও যে যার মত তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। এক মেয়ে থাকেন তার সঙ্গে। কেউ তেমন একটা খোঁজ রাখে না অসহায় এই বৃদ্ধার।
চোখের পানি ফেলে কুলসুম বলেন, গণ্ডগোলের বছর (১৯৭১ সাল) মিলিটারির ভয়ে কোলের মদ্দে ছেলেরে নিয়া দৌড় দিছি কত, আর সেই ব্যাটা এখন আমার কোনো খোঁজ রাহে না।
জানা যায়, কুলসুম বেগমের ২ ছেলে ৫ মেয়ে। বড় ছেলে স্ত্রী সন্তান রেখে মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। আর মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। আরেক ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। এক মেয়ে তার সঙ্গে থাকেন। তার কোনো জমি-জমা নেই। ছেলের বাড়িতেও তার ঠাঁই মেলেনি। অন্যের ফসলি দুই কাঠা জায়গার উপর একটি দুচালা ঘর তুলে বসবাস করছেন তিনি। জমির মালিক এখনো তাকে দলিল করে দেয়নি। স্বামী কালাচাঁদ এর মৃত্যুর পর দুই ছেলেকে বেশ কষ্টে লালন পালন করছেন। এরই মধ্যে বড় ছেলের মৃত্যু হয়েছে। অন্য ছেলে-মেয়েরা মাঝে মধ্যে খোঁজ নিলেও কেউ কাছে রাখতে পারেন না।
বৃদ্ধ বয়সে কি করে সংসার চলে? জানতে চাইলে তিনি জানান, বয়স্ক ভাতা তিন মাস অন্তর অন্তর যা পান তাই দিয়েই চলে। মানুষের কাছে হাত পাততে তার লজ্জা করে। আর মেয়ে মানুষের বাড়িতে আয়া হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু করোনার কারণে তার কাজও বন্ধ। তাই রমজান মাসে কী খেয়ে রোজা রাখবেন তা নিয়ে চিন্তিত।
কুলসুম বেওয়া বলেন, আইতে (রাতে) কি খামু ঘরে কোনো তরকারি নাই। কী যে একটা ব্যামার (রোগ) আইলো, আওনের (পর) থ্যাইক্যা (থেকে) আমার মিয়াডার কাম সব বন্দ (বন্ধ) হইয়া গেছে। কী করমু (করবো), কই জামু! কে খাওয়াইবে! খামু কী? এহন (এখন) আবার রোজার মাস আইয়া (এসে) পড়ছে। জিনিসের যেই (বেশি) দাম। কী খাইয়া রোজা থাহুম?’ ঘরে খাওন (খাবার) নাই, উপজেলার স্যার একদিন কিছু ডাইল চাইল দিয়্যা গেছিলো। চাইল আছে, কইদিন চলবো। ভাত-ভর্তা ছাড়া আর কিছু জুটে না। এই দিয়্যা চইলত্যাছি।
অসহায় এই নারীর মেয়ে বেগম জানান, সারা জীবন মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেছেন। এখন বয়স হয়েছে। শরীরও অসুস্থ অনেক। তাই আগের মত কাজ করতে পারেন না। এই শরীর নিয়ে দুইটা বাড়িতে বুয়ার কাজ করেন, এভাবেই ছুটা কাজে তার কোনোমতে দিন চলছিল। কিন্তু করোনার কারণে তিনি কাজ করতে পারছেন না। বাড়িওয়ালা যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন। স্বামী পরিত্যক্ত হলেও আজও পায়নি ভাতার একটি কার্ড।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনিরুল ইসলাম সাবু বলেন, আমরা প্রতিদিনই ত্রাণ দিচ্ছি অনেককে। মেয়র সাহেবকে জানিয়ে দ্রুত তার জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিহাব রায়হান বলেন, সরকারি ত্রাণ হিসেবে ওই পরিবারের দুই সদস্যকে আমি ২০ কেজি চাল ১০ কেজি তরিতরকারি রোজার আগে বাড়িতে গিয়ে দিয়ে এসেছি। পরবর্তী কোনো সহযোগিতা পেলে তাদের দেওয়া হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















